কিডনি রোগের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
গুরুত্বপূর্ণ ঔষধের লক্ষণভিত্তিক নির্বাচন
ভূমিকা
কিডনি মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল অপসারণ করে, শরীরের পানি ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ, লোহিত রক্তকণিকা তৈরি ও হাড়ের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে ভূমিকা রাখে।
কিডনি রোগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগীর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তাই কেবল উপসর্গের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি রোগ নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণে eGFR এবং প্রস্রাবের অ্যালবুমিন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কিডনি রোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ
কিডনি রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া।
রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া।
প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা।
প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া।
প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া।
কোমর বা কিডনি অঞ্চলে ব্যথা।
চোখের চারপাশ, মুখ, পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া।
দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি।
ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব বা বমি।
ত্বকে চুলকানি ও শুষ্কতা।
মাংসপেশিতে খিঁচুনি বা টান লাগা।
ঘুমের সমস্যা ও মনোযোগে অসুবিধা।
উন্নত পর্যায়ের কিডনি রোগে এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
কিডনি রোগে গুরুত্বপূর্ণ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় শুধু “কিডনি রোগ” নামের ওপর ভিত্তি করে ঔষধ নির্বাচন না করে রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি, ব্যথার প্রকৃতি, প্রস্রাবের পরিবর্তন, তৃষ্ণা, উষ্ণতা ও শীতের প্রভাব, রোগের কারণ এবং অন্যান্য সহগামী লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।
নিচের ঔষধগুলোকে কিডনি ও মূত্রনালির বিভিন্ন লক্ষণসমষ্টির সঙ্গে প্রচলিত হোমিওপ্যাথিক Materia Medica-তে বিবেচনা করা হয়।
১. এপিস মেলিফিকা
কিডনি অঞ্চলে ব্যথার সঙ্গে শরীরে শোথ বা ফোলা।
চোখের পাতা ও চোখের চারপাশে বিশেষভাবে ফোলা।
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা প্রস্রাব বন্ধ হওয়ার প্রবণতা।
পিপাসা খুব কম বা একেবারেই না থাকা।
গরমে উপসর্গ বৃদ্ধি এবং ঠান্ডায় আরাম।
শোথের সঙ্গে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে এপিসের লক্ষণসমষ্টি বিশেষভাবে বিবেচ্য।
মূল ভাব: শোথ, তৃষ্ণাহীনতা, কম প্রস্রাব এবং গরমে বৃদ্ধি।
২. বার্বারিস ভালগারিস
কিডনি অঞ্চলে তীব্র, ছেদনকারী বা সুচ ফোটার মতো ব্যথা।
ব্যথা কিডনি থেকে মূত্রনালি, মূত্রথলি, উরু বা পায়ের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে।
কিডনি অঞ্চলে চাপ দিলে ব্যথা বৃদ্ধি।
নড়াচড়ায় ব্যথা বাড়তে পারে।
প্রস্রাবের সময় জ্বালা ও কষ্ট।
কিডনি অঞ্চলের ব্যথা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া বার্বারিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
মূল ভাব: কিডনি থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা।
৩. লাইকোপোডিয়াম
ডান কিডনি অঞ্চলের উপসর্গ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কিডনি বা কোমরের ব্যথা মূত্রনালি, মূত্রথলি বা নিম্নাঙ্গের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে।
বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে উপসর্গ বৃদ্ধি।
প্রস্রাবে লালচে বা ইটের গুঁড়ার মতো তলানি।
প্রস্রাব শুরু হতে দেরি হওয়া বা প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল হওয়া।
পেট ফাঁপা ও হজমের সমস্যার সঙ্গে মূত্রনালির উপসর্গ থাকলে লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: ডানদিকে প্রবণতা, ৪–৮টার বৃদ্ধি ও প্রস্রাবের লালচে তলানি।
৪. টেরিবিন্থিনা
কিডনি অঞ্চলে অত্যন্ত তীব্র ব্যথা ও জ্বালা।
অল্প পরিমাণ প্রস্রাব।
প্রস্রাবে রক্তের উপস্থিতি।
প্রস্রাবের সময় তীব্র জ্বালা।
কিডনি ও মূত্রনালির তীব্র জ্বালাযুক্ত অবস্থার লক্ষণসমষ্টিতে টেরিবিন্থিনা বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: তীব্র জ্বালা, কিডনি ব্যথা, অল্প ও রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব।
৫. সলিডেগো
কিডনি অঞ্চলে ব্যথা ধীরে ধীরে পেট বা মূত্রথলির দিকে ছড়িয়ে যায়।
কিডনি অঞ্চলে চাপ দিলে ব্যথা বৃদ্ধি।
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া।
প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া।
কিডনি অঞ্চলের ব্যথার সঙ্গে মূত্রত্যাগের অসুবিধা থাকলে সলিডেগোর লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: কিডনি ব্যথা, চাপের অসহিষ্ণুতা ও মূত্রত্যাগের কষ্ট।
৬. মার্কিউরিয়াস সলুবিলিস
এক বা উভয় কিডনিতে ব্যথা।
ব্যথা মূত্রথলি বা উরুর দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে।
বারবার প্রস্রাবের বেগ।
অল্প অল্প প্রস্রাব।
প্রস্রাবের সময় জ্বালা ও কষ্ট।
রোগীর অস্থিরতা এবং মূত্রনালির প্রদাহজনিত লক্ষণসমষ্টি থাকলে ঔষধটি বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: ঘনঘন বেগ, অল্প প্রস্রাব, জ্বালা ও ব্যথা।
৭. ক্যানথারিস
প্রস্রাবের সময় অত্যন্ত তীব্র জ্বালা ও ব্যথা।
বারবার প্রস্রাবের বেগ কিন্তু অল্প অল্প প্রস্রাব।
মূত্রথলি ও মূত্রনালিতে তীব্র জ্বালাযুক্ত অনুভূতি।
প্রস্রাবের আগে, সময় ও পরে তীব্র কষ্ট থাকতে পারে।
তীব্র মূত্রনালির জ্বালাযুক্ত লক্ষণসমষ্টিতে ক্যানথারিসের কথা বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: তীব্র জ্বালা, ঘনঘন বেগ ও অল্প প্রস্রাব।
৮. সার্সাপ্যারিলা
প্রস্রাবের শেষে তীব্র জ্বালা বা ব্যথা।
প্রস্রাবের সময় বিশেষ কষ্ট।
দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে অসুবিধা, কিন্তু বসে বা অন্য অবস্থায় তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়া।
মূত্রনালির তীব্র জ্বালাযুক্ত উপসর্গের সঙ্গে এ ধরনের বিশেষ Modalities থাকলে সার্সাপ্যারিলা বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: প্রস্রাবের শেষে তীব্র জ্বালা এবং অবস্থাভেদে প্রস্রাবের পরিবর্তন।
৯. বেরবেরিস ভলগারিস
কিডনি থেকে মূত্রনালির পথে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা।
কোমর থেকে উরু বা নিম্নাঙ্গে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া।
নড়াচড়া ও চাপের সঙ্গে উপসর্গের পরিবর্তন।
প্রস্রাবে তলানি বা কিডনি অঞ্চলের অস্বস্তির সঙ্গে ব্যথা থাকলে লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: কিডনি অঞ্চলের ব্যথার বিস্তৃত Irradiation।
১০. একোনাইট নেপিলাস
ঠান্ডা লাগার পর আকস্মিকভাবে অসুস্থতা শুরু।
জ্বর, অস্থিরতা ও ছটফটানি।
প্রস্রাবের সময় জ্বালা ও কষ্ট।
তীব্র ভয় বা মৃত্যুভয়।
আকস্মিক ও তীব্র প্রাথমিক অবস্থার সঙ্গে এই মানসিক লক্ষণ থাকলে একোনাইটের লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: আকস্মিকতা, তীব্রতা, অস্থিরতা ও ভয়।
১১. বারাইটাম কার্ব
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি বা মূত্রনালির সমস্যার সঙ্গে দুর্বলতা ও বয়স্ক রোগীর বিভিন্ন অবক্ষয়জনিত প্রবণতা থাকলে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণসমষ্টি অনুযায়ী বারাইটাম কার্ব বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, দুর্বলতা ও অবক্ষয়জনিত প্রবণতা।
১২. ক্যানাবিস স্যাটিভা
মূত্রনালিতে জ্বালা ও অস্বস্তি।
প্রস্রাবের প্রবাহে পরিবর্তন।
মূত্রনালির পথে ব্যথা বা অস্বাভাবিক অনুভূতি।
মূত্রনালির উপসর্গের সঙ্গে রোগীর বিশেষ Sensation ও Modalities থাকলে ক্যানাবিস স্যাটিভা বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: মূত্রনালির জ্বালা ও অস্বাভাবিক Sensation।
১৩. ইউরেটিকা ইউরেন্স
মূত্রের পরিমাণ ও মূত্রত্যাগের পরিবর্তনের সঙ্গে শোথ বা তরল জমার লক্ষণ থাকলে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ অনুযায়ী ইউরেটিকা ইউরেন্স বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: মূত্রের পরিবর্তন ও তরল জমার প্রবণতা।
১৪. পালসেটিলা
প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল বা অনিয়মিত।
প্রস্রাবের সমস্যা পরিবর্তনশীল প্রকৃতির।
তৃষ্ণা কম।
গরম পরিবেশে অস্বস্তি এবং খোলা বাতাসে আরাম পাওয়ার প্রবণতা।
নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত বা অন্যান্য পরিবর্তনশীল উপসর্গের সঙ্গে মূত্রনালির সমস্যা থাকলে সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: পরিবর্তনশীল উপসর্গ, তৃষ্ণাহীনতা ও উষ্ণতায় অস্বস্তি।
১৫. সালফার
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি বা মূত্রনালির সমস্যার সঙ্গে ত্বকের চুলকানি, শুষ্কতা, গরমে অস্বস্তি এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক লক্ষণ থাকলে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ অনুযায়ী সালফার বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, ত্বকের উপসর্গ ও গরমে অস্বস্তি।
১৬. সেপিয়া
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মূত্রনালির সমস্যার সঙ্গে পেলভিক অঞ্চলের ভারী অনুভূতি, হরমোন-সম্পর্কিত পরিবর্তন, দুর্বলতা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ থাকলে সেপিয়ার সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: নারীজনিত সহগামী লক্ষণ ও পেলভিক ভারী অনুভূতি।
১৭. ন্যাট্রাম মিউর
মূত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, শুষ্কতা, তৃষ্ণার বিশেষ ধরন এবং রোগীর স্বতন্ত্র সাংবিধানিক লক্ষণ থাকলে ন্যাট্রাম মিউর বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: শুষ্কতা, বিশেষ তৃষ্ণা ও সাংবিধানিক লক্ষণ।
১৮. ফসফরাস
প্রস্রাবে রক্ত, দুর্বলতা, অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাংবিধানিক লক্ষণ একত্রে থাকলে ফসফরাস বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: রক্তমিশ্রিত প্রস্রাবের সঙ্গে বিশেষ সাংবিধানিক লক্ষণ।
১৯. ফেরাম ফস
জ্বর ও প্রদাহজনিত লক্ষণের প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি অঞ্চলে ব্যথা থাকলে প্রচলিত বায়োকেমিক পদ্ধতিতে ফেরাম ফস বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: প্রাথমিক প্রদাহজনিত অবস্থা ও জ্বর।
২০. কালি মিউর
কিডনি বা মূত্রনালির উপসর্গের সঙ্গে জিহ্বায় সাদা আবরণ, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ থাকলে প্রচলিত বায়োকেমিক পদ্ধতিতে কালি মিউর বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: সাদা জিহ্বার আবরণ ও সহগামী উপসর্গ।
২১. ক্যালকেরিয়া সালফ
দুর্বলতা, রক্তস্বল্পতার প্রবণতা এবং প্রস্রাবসংক্রান্ত উপসর্গের সঙ্গে কোমর বা কিডনি অঞ্চলে ব্যথা থাকলে প্রচলিত বায়োকেমিক পদ্ধতিতে ক্যালকেরিয়া সালফ বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: দুর্বলতা ও কিডনি-মূত্রনালির সহগামী লক্ষণ।
২২. কালি ফস
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে মানসিক ও স্নায়বিক দুর্বলতা, অবসাদ এবং ঘুমের সমস্যার মতো উপসর্গ থাকলে প্রচলিত বায়োকেমিক পদ্ধতিতে কালি ফস বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: স্নায়বিক দুর্বলতা ও অবসাদ।
লক্ষণ অনুযায়ী দ্রুত ঔষধ নির্বাচন
কিডনি অঞ্চলে তীব্র ব্যথা ও ব্যথা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেলে
বার্বারিস ভলগারিস।
কিডনি ব্যথার সঙ্গে লালচে বা ইটের গুঁড়ার মতো তলানি
লাইকোপোডিয়াম।
কিডনি ব্যথা, শোথ, তৃষ্ণাহীনতা ও কম প্রস্রাব
এপিস মেলিফিকা।
কিডনি অঞ্চলে তীব্র জ্বালা ও রক্তমিশ্রিত অল্প প্রস্রাব
টেরিবিন্থিনা।
কিডনি ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাব কম এবং মূত্রত্যাগে কষ্ট
সলিডেগো।
তীব্র জ্বালা, ঘনঘন প্রস্রাবের বেগ ও অল্প প্রস্রাব
ক্যানথারিস।
প্রস্রাবের শেষে তীব্র জ্বালা
সার্সাপ্যারিলা।
আকস্মিক জ্বর, অস্থিরতা, ভয় ও প্রস্রাবে জ্বালা
একোনাইট নেপিলাস।
ঘনঘন প্রস্রাবের বেগ, অল্প প্রস্রাব, জ্বালা ও ব্যথা
মার্কিউরিয়াস সলুবিলিস।
কিডনি রোগে কোন পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ
কিডনি রোগের ক্ষেত্রে শুধু উপসর্গের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক নিচের পরীক্ষাগুলো বিবেচনা করতে পারেন:
সিরাম ক্রিয়েটিনিন।
eGFR।
Urinalysis বা প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা।
Urine Albumin-to-Creatinine Ratio বা UACR।
রক্তের ইউরিয়া ও ইলেক্ট্রোলাইট।
রক্তে গ্লুকোজ।
রক্তচাপ পরিমাপ।
প্রয়োজন অনুযায়ী কিডনির আল্ট্রাসনোগ্রাম।
UACR প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের পরিমাণ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং eGFR কিডনির ফিল্টার করার ক্ষমতা মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়।
UACR ৩০ mg/g-এর বেশি হলে অ্যালবুমিনুরিয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয় এবং ফলাফল চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
প্রস্রাবে ফেনা দেখা দিলে
প্রস্রাবে বারবার অতিরিক্ত ফেনা দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কিডনির ফিল্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যালবুমিন বা অন্যান্য প্রোটিন প্রস্রাবে চলে যেতে পারে। তবে প্রতিবার ফেনাযুক্ত প্রস্রাব মানেই কিডনি রোগ নয়। বারবার এমন হলে প্রস্রাব পরীক্ষা ও UACR করা যেতে পারে।
প্রস্রাবে রক্ত গেলে
প্রস্রাবে রক্ত কিডনি রোগের পাশাপাশি কিডনিতে পাথর, মূত্রনালির সংক্রমণ, অন্যান্য মূত্রনালির সমস্যা বা আরও কিছু গুরুতর রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই প্রস্রাবে দৃশ্যমান রক্ত দেখা গেলে শুধু হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কিডনি রোগে শোথ
কিডনি অতিরিক্ত পানি ও লবণ যথাযথভাবে বের করতে না পারলে শরীরে তরল জমে পা, গোড়ালি, মুখ বা চোখের চারপাশে শোথ হতে পারে। প্রস্রাবে বেশি প্রোটিন বের হলেও শোথ দেখা দিতে পারে।
কিডনি রোগে খাদ্য ও জীবনযাপন
কিডনি রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী খাদ্য পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে। তাই সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা প্রযোজ্য নয়।
লবণ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ডায়াবেটিস থাকলে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা।
ধূমপান পরিহার করা।
অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণ করা।
অপ্রয়োজনীয় ব্যথানাশক বা অন্যান্য ঔষধ দীর্ঘদিন নিজে থেকে গ্রহণ না করা।
পানি অতিরিক্ত বা অতি কম পান করার সিদ্ধান্ত নিজে থেকে না নেওয়া; কিডনি রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা।
জরুরি সতর্কতা
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন:
প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
প্রস্রাবের সঙ্গে দৃশ্যমান রক্ত যাওয়া।
তীব্র কিডনি বা কোমর ব্যথা।
জ্বর ও কাঁপুনির সঙ্গে কিডনি অঞ্চলে ব্যথা।
হঠাৎ শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যাওয়া।
শ্বাসকষ্ট।
বারবার বমি।
অতিরিক্ত দুর্বলতা বা চেতনায় পরিবর্তন।
কিডনি রোগের গুরুতর পর্যায়ে ক্ষুধামন্দা, বমি, ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগে অসুবিধা, চুলকানি, মাংসপেশিতে খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট ও শোথের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
উপসংহার
কিডনি রোগ একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। একই রোগের নাম হলেও প্রত্যেক রোগীর লক্ষণ এক রকম হয় না। তাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টি, ব্যথার ধরন, প্রস্রাবের বৈশিষ্ট্য, শোথ, তৃষ্ণা, উষ্ণতা-শীতের প্রভাব, সময়ভেদে উপসর্গের পরিবর্তন এবং অন্যান্য সহগামী লক্ষণ বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
তবে কিডনি রোগের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় ও রোগের মাত্রা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে eGFR ও প্রস্রাবের অ্যালবুমিন/UACR-এর মতো পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কিডনি রোগে গুরুতর বা দ্রুত অবনতিশীল অবস্থা থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত না করে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
লেখক
ডাঃ ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, এ আর টাওয়ার, রুম নাম্বার ৯, আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে। মোবাইল নাম্বার 01716651488
