ধ্বজভঙ্গের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
ধ্বজভঙ্গ (Impotency/Erectile Dysfunction) কী? কারণ, লক্ষণ ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা।
ধ্বজভঙ্গ কী?
পুরুষের যৌনমিলনের জন্য লিঙ্গে পর্যাপ্ত দৃঢ়তা (erection) তৈরি না হওয়া অথবা তৈরি হলেও যৌনমিলন সম্পন্ন করার মতো সময় ধরে তা বজায় রাখতে না পারাকে সাধারণভাবে ধ্বজভঙ্গ বলা হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে Erectile Dysfunction (ED) বলা হয়।
তবে যৌন ইচ্ছা, যৌন উত্তেজনা, ইরেকশনের দৃঢ়তা, বীর্যপাত এবং সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা—এগুলো এক বিষয় নয়। তাই শুধু যৌনক্ষমতা কিছুটা কমে যাওয়া বা কোনো একদিন ইরেকশন কম হওয়াকে ধ্বজভঙ্গ বলা ঠিক নয়।
অনেক পুরুষ অযথা ভয় ও দুশ্চিন্তার কারণে নিজেকে ধ্বজভঙ্গ রোগে আক্রান্ত মনে করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন ও অতিরঞ্জিত যৌন-শক্তিবর্ধক প্রচারণা এ ধরনের ভয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ধ্বজভঙ্গের সম্ভাব্য কারণ
ধ্বজভঙ্গের কারণ শারীরিক, মানসিক অথবা উভয় ধরনের হতে পারে।
শারীরিক কারণ
- ডায়াবেটিস
- উচ্চ রক্তচাপ
- হৃদ্রোগ ও রক্তনালীর সমস্যা
- স্থূলতা
- হরমোনের সমস্যা
- টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া
- স্নায়ুর সমস্যা
- লিঙ্গ বা পেলভিক অঞ্চলে আঘাত
- দীর্ঘদিনের কিছু রোগ
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান
মানসিক কারণ
- অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
- যৌনমিলন নিয়ে ভয়
- আত্মবিশ্বাসের অভাব
- বিষণ্নতা
- দাম্পত্য সমস্যা
- পূর্বের ব্যর্থ যৌন অভিজ্ঞতার কারণে Performance Anxiety
- অতিরিক্ত যৌন চিন্তা বা মানসিক চাপ
হস্তমৈথুন কি ধ্বজভঙ্গের কারণ?
হস্তমৈথুনকে ধ্বজভঙ্গের সরাসরি ও স্থায়ী কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে কোনো ব্যক্তির যৌন আচরণ যদি অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অপরাধবোধ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, তাহলে যৌনক্ষমতার ওপর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
তাই শুধু অতীতে হস্তমৈথুনের ইতিহাস আছে বলে একজন পুরুষকে “যৌনশক্তিহীন” মনে করা উচিত নয়।
যৌন দুর্বলতা ও বন্ধ্যাত্ব কি একই?
না।
ধ্বজভঙ্গের প্রধান সমস্যা হলো যৌনমিলনের জন্য পর্যাপ্ত ইরেকশন তৈরি বা বজায় রাখতে না পারা। অন্যদিকে বন্ধ্যাত্ব হলো পর্যাপ্ত সময় নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনমিলনের পরও সন্তান ধারণে সমস্যা হওয়া।
একজন পুরুষের Erectile Dysfunction থাকতে পারে কিন্তু তার শুক্রাণু স্বাভাবিক হতে পারে। আবার ইরেকশন স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও শুক্রাণুর সমস্যা থাকতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
মাঝে মাঝে ইরেকশন কম হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা যদি বারবার হয় বা দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, স্থূলতা অথবা দীর্ঘদিনের অন্য কোনো রোগ থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
কারণ Erectile Dysfunction কখনো কখনো রক্তনালীর সমস্যার একটি প্রাথমিক সংকেতও হতে পারে।
ধ্বজভঙ্গের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগের নামমাত্র দেখে ওষুধ নির্বাচন না করে রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টি, মানসিক অবস্থা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যৌন লক্ষণ, পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ বিবেচনা করে ওষুধ নির্বাচন করার নীতি অনুসরণ করা হয়।
Materia Medica ও Repertory-তে পুরুষের যৌন দুর্বলতা, ইরেকশনের ঘাটতি, অতিরিক্ত যৌনচিন্তা, দ্রুত বীর্যপাত, স্বপ্নদোষ এবং যৌন অতিরিক্ততার পর দুর্বলতা ইত্যাদি লক্ষণের সঙ্গে বিভিন্ন ঔষধের সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়েছে।
ধ্বজভঙ্গের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু হোমিওপ্যাথিক ঔষধ
১. Selenium
যৌন ইচ্ছা প্রবল থাকা সত্ত্বেও ইরেকশন দুর্বল হওয়া, দ্রুত বীর্যপাত, ঘন ঘন স্বপ্নদোষ এবং যৌনমিলনের পর অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ থাকলে Materia Medica-তে Selenium বিবেচিত হয়।
২. Agnus castus
যৌন ইচ্ছা ও যৌনক্ষমতার মধ্যে অসামঞ্জস্য, পুরুষাঙ্গ শিথিলতা এবং যৌন দুর্বলতার বিশেষ লক্ষণ থাকলে Agnus castus Repertory ও Materia Medica-তে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঔষধ।
বিশেষ করে কিছু ক্ষেত্রে অতীতের যৌন অতিরিক্ততা বা গনোরিয়ার পরবর্তী যৌন দুর্বলতার সঙ্গে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
৩. Caladium
যৌন ইচ্ছা থাকলেও পর্যাপ্ত ইরেকশন না হওয়া বা ইরেকশন বজায় রাখতে না পারার বিশেষ লক্ষণে Caladium বিবেচনা করা হয়।
যৌনমিলনের ক্ষেত্রে ইরেকশনের ঘাটতি এবং যৌনক্ষমতার অসামঞ্জস্য থাকলে রোগীর অন্যান্য লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে এই ঔষধ নির্বাচন করা যেতে পারে।
৪. Lycopodium
ধ্বজভঙ্গের সঙ্গে হজমের সমস্যা, পেট ফাঁপা, গ্যাস, প্রস্রাবের সমস্যা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট মানসিক বৈশিষ্ট্য থাকলে Lycopodium একটি গুরুত্বপূর্ণ Repertorial remedy হিসেবে বিবেচিত হয়।
৫. Nux vomica
অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম, অনিয়মিত জীবনযাপন, দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা, উদ্দীপক পদার্থের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং যৌন দুর্বলতার বিশেষ লক্ষণসমষ্টিতে Nux vomica বিবেচনা করা হয়।
৬. Acidum phosphoricum
দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর যৌনক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণে Acidum phosphoricum-এর উল্লেখ Materia Medica-তে রয়েছে।
৭. Staphysagria
যৌন অতিরিক্ততা, যৌন আচরণের পরবর্তী দুর্বলতা এবং বিশেষ মানসিক লক্ষণের সঙ্গে যৌনক্ষমতার সমস্যা থাকলে Staphysagria বিবেচনা করা হয়।
৮. Kali bromatum
অতিরিক্ত যৌনচিন্তা, যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা, হস্তমৈথুনের প্রবণতা এবং এর সঙ্গে মানসিক বা স্নায়বিক দুর্বলতার লক্ষণ থাকলে Kali bromatum-এর কথা Repertory ও Materia Medica-তে পাওয়া যায়।
৯. Argentum nitricum
যৌন দুর্বলতার সঙ্গে মানসিক চাপ, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা, শারীরিক অবসাদ, মাথা ঘোরা এবং অতীতের যৌন অতিরিক্ততার ইতিহাস থাকলে Argentum nitricum রোগীর সামগ্রিক লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে।
১০. Avena sativa
শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, স্নায়বিক দুর্বলতা এবং যৌন দুর্বলতার সমন্বিত চিত্রে Avena sativa-এর ব্যবহার হোমিওপ্যাথিক সাহিত্যে উল্লেখ রয়েছে।
১১. Calcarea carbonica
শারীরিক গঠন, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, হজমের সমস্যা, মানসিক বৈশিষ্ট্য এবং যৌন লক্ষণ—সবকিছু একত্রে বিবেচনা করে Calcarea carbonica নির্বাচন করা যেতে পারে।
১২. Phosphoricum acidum
দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, মানসিক অবসাদ, শারীরিক দুর্বলতা এবং যৌনক্ষমতা কমে যাওয়ার সমন্বিত লক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঔষধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
Repertory-ভিত্তিক ঔষধ নির্বাচন
ধ্বজভঙ্গের ক্ষেত্রে একটি মাত্র Rubric দিয়ে ওষুধ নির্বাচন না করে রোগীর প্রধান ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণগুলো একত্রে বিচার করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
Boger Repertory-তে Spermatorrhea, sexual debility, deficient physical power, nocturnal pollution ইত্যাদি Rubric-এর অধীনে বিভিন্ন ঔষধ পাওয়া যায়।
Kent Repertory-তে Sexual excesses, after, Wanting (impotency) এবং Sexual passion diminished ইত্যাদি Rubric-এর অধীনে বিভিন্ন ঔষধের উল্লেখ রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে নিম্নলিখিত ঔষধগুলো বিভিন্ন Rubric-এ পাওয়া যায়—
Agnus castus, Caladium, Calcarea carbonica, Lycopodium, Nux vomica, Phosphoricum acidum, Phosphorus, Selenium, Staphysagria, Sulphur, Conium, Argentum nitricum, Acidum picricum, Silicea প্রভৃতি।
তবে Repertory-তে কোনো Rubric-এর অধীনে কোনো ঔষধের উপস্থিতি মানেই সেই ঔষধ প্রত্যেক রোগীর জন্য উপযুক্ত—এমন নয়। রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি এবং Materia Medica-র সঙ্গে মিলিয়ে চূড়ান্ত নির্বাচন করা উচিত।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ধ্বজভঙ্গের রোগী অনেক সময় মানসিকভাবে অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া এবং অযথা ভয় দূর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাস্তার বিজ্ঞাপন, তথাকথিত যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ বা অজানা উপাদানের হারবাল/উত্তেজক ওষুধের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এসব পণ্যের উপাদান ও নিরাপত্তা সবসময় নিশ্চিত থাকে না এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতির ঝুঁকিও থাকতে পারে।
নিজে নিজে কোনো হোমিওপ্যাথিক ঔষধের শক্তি বা মাত্রা নির্ধারণ করে দীর্ঘদিন সেবন করাও সমীচীন নয়। একজন প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের মাধ্যমে রোগীর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গ্রহণ করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
উপসংহার
ধ্বজভঙ্গ একটি সংবেদনশীল কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। এটি পুরুষত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয় এবং এই সমস্যার কারণে একজন পুরুষকে নিজেকে অসহায় মনে করার কোনো কারণ নেই।
প্রথমে সমস্যাটি সত্যিই Erectile Dysfunction কি না এবং এর পেছনে কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণ আছে কি না তা বোঝা জরুরি। এরপর রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টি অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা উচিত।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় Repertory ও Materia Medica অনুসারে রোগীর স্বতন্ত্র লক্ষণ বিশ্লেষণ করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়। তবে হোমিওপ্যাথি Erectile Dysfunction নিরাময় করে—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত নয়; তাই প্রয়োজনীয় প্রচলিত চিকিৎসা মূল্যায়ন বা চিকিৎসা বাদ দেওয়া উচিত নয়।
নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে একজন যোগ্য ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লেখক:
ডাঃ মোঃ ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি- বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
ইভা হোমিও হল
বাইপাইল, সাভার, ঢাকা
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
01716651488/ 01686981445

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Welcome to you our website