মায়েলাইটিসের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

মায়েলাইটিস (Myelitis) কী?
মায়েলাইটিস হলো মেরুরজ্জু বা Spinal Cord-এর প্রদাহজনিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়বিক সমস্যা। মেরুরজ্জু মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে স্নায়ুর সংকেত বহন করে। তাই মেরুরজ্জুতে প্রদাহ বা ক্ষতি হলে শরীরের বিভিন্ন অংশে দুর্বলতা, অসাড়তা, ঝিনঝিন, ব্যথা, হাঁটতে অসুবিধা এবং প্রস্রাব-পায়খানার কার্যক্রমে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

মায়েলাইটিসের কারণ বিভিন্ন হতে পারে। সংক্রমণ, প্রদাহজনিত বা অটোইমিউন সমস্যা এবং অন্যান্য স্নায়বিক অবস্থার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করাও কঠিন হতে পারে।

পিঠের ব্যথা আর মায়েলাইটিস এক নয়
আমাদের দেশে পিঠ বা কোমরে ব্যথা হলে অনেক সময় রোগীকে বলা হয়—“মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয় হয়েছে।” কিন্তু পিঠের ব্যথার কারণ একাধিক হতে পারে। পেশির টান, মেরুদণ্ডের বয়সজনিত পরিবর্তন, ডিস্কের সমস্যা, স্নায়ুর ওপর চাপ, আঘাত কিংবা প্রদাহ—বিভিন্ন কারণেই পিঠে ব্যথা হতে পারে।

শুধু কোনো পরীক্ষায় মেরুদণ্ডে বয়সজনিত পরিবর্তন পাওয়া গেলেই সেটিকে ব্যথার একমাত্র কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার মায়েলাইটিসের মতো স্নায়বিক সমস্যা থাকলে সেটিকে সাধারণ পিঠের ব্যথা বা “হাড় ক্ষয়” বলে অবহেলা করাও উচিত নয়।
হোমিওপ্যাথির দৃষ্টিতে রোগী ও লক্ষণ
হোমিওপ্যাথি একটি লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এখানে রোগের নামের পাশাপাশি রোগীর স্বতন্ত্র লক্ষণ, রোগের শুরু, কারণ বা পূর্বাপর ইতিহাস, ব্যথার প্রকৃতি, কোন অবস্থায় ব্যথা বাড়ে বা কমে, অসাড়তা, ঝিনঝিন, দুর্বলতা, মানসিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
অর্থাৎ একই রোগের নাম হলেও প্রত্যেক রোগীর জন্য একই ঔষধ প্রযোজ্য হবে—এমন নয়। রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টিই ঔষধ নির্বাচনের প্রধান ভিত্তি।


মায়েলাইটিসে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ
নিচের ঔষধগুলো হোমিওপ্যাথিক Materia Medica-তে মেরুদণ্ড, মেরুরজ্জু ও সংশ্লিষ্ট স্নায়বিক উপসর্গের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো শিক্ষামূলক লক্ষণ-আলোচনা, নির্দিষ্ট রোগীর প্রেসক্রিপশন নয়।
১. Abrotanum — এব্রোটেনাম
মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা, নড়াচড়ায় ব্যথা বৃদ্ধি এবং উপুড় হয়ে শুলে আরাম—এ ধরনের লক্ষণে বিবেচিত।
২. Aconitum — অ্যাকোনাইট
হঠাৎ অসাড়তা, মুখ বা জিহ্বায় সংবেদন কমে যাওয়া, হাত-পায়ে ঝিনঝিন এবং স্পর্শানুভূতি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ।
৩. Alumina — অ্যালুমিনা
মেরুদণ্ডে তপ্ত লোহার মতো ব্যথা, অসাড়তা, দুর্বলতা বা পক্ষাঘাতের প্রবণতা। বসে থাকলে নিতম্বে অসাড়তা।
৪. Anacardium — অ্যানাকার্ডিয়াম
শরীর শক্ত করে বাঁধা থাকার মতো অনুভূতি, মেরুদণ্ডে ছুঁচালো ব্যথা, অঙ্গের দুর্বলতা, জিহ্বা ভারী লাগা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সঙ্গে।
৫. Apis mellifica — অ্যাপিস
কোমর ও স্যাক্রামে তীব্র ব্যথা, বসতে কষ্ট, হাত দিয়ে কিছু ধরতে অসুবিধা, হাত-পায়ে দুর্বলতা বা অসাড়তা।
৬. Arsenicum album — আর্সেনিকাম অ্যালবাম
মেরুরজ্জু-সম্পর্কিত ব্যাপক দুর্বলতার সঙ্গে উদ্বেগ, শ্বাসকষ্ট, বুক বাঁধা অনুভূতি এবং হাত-পা ঠান্ডা ও অসাড় হওয়ার মতো লক্ষণ।
৭. Belladonna — বেলাডোনা
মেরুদণ্ডে ছুরিকাঘাতের মতো ব্যথা, জ্বালা ও দপদপানি, কোমরে খিঁচ ধরার মতো ব্যথা এবং অসাড়তা।
৮. Bryonia — ব্রায়োনিয়া
বিশেষ করে আঘাতের পর মেরুদণ্ডে ব্যথা এবং সামান্য নড়াচড়াতেই ব্যথা বেড়ে যাওয়া। স্থির থাকলে তুলনামূলক আরাম।
৯. Cocculus indicus — ককিউলাস ইন্ডিকাস
মেরুদণ্ডে টান বা খিঁচ ধরার অনুভূতি, হাত-পায়ে ঝিনঝিন, অসাড়তা ও দুর্বলতা; নড়াচড়ায় বৃদ্ধি।
১০. Dulcamara — ডালকামারা
ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার পর উপসর্গ শুরু বা বৃদ্ধি; মেরুদণ্ড ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ব্যথা।
১১. Gelsemium — জেলসেমিয়াম
অতিরিক্ত দুর্বলতা, ইচ্ছামতো অঙ্গ নড়াতে অসুবিধা, ঝাপসা দৃষ্টি এবং জিহ্বা বা গলার দুর্বলতার মতো লক্ষণ।
১২. Mercurius — মার্কিউরিয়াস
পা, মূত্রথলি ও মলত্যাগের পেশিতে দুর্বলতা; মেরুদণ্ডে ব্যথা ও আক্রান্ত অংশে সংবেদন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ।
১৩. Nux vomica — নাক্স ভমিকা
কোমর শক্ত করে বাঁধা থাকার মতো অনুভূতি, হাত-পায়ে অবশভাব, ঝিনঝিন ও দুর্বলতা; সকালে পায়ে শক্তির অভাব।
১৪. Opium — ওপিয়াম
পক্ষাঘাতের সঙ্গে জিহ্বার দুর্বলতা, কথা বলতে অসুবিধা, মূত্রথলির কার্যকারিতায় সমস্যা ও মূত্র আটকে যাওয়ার প্রবণতা।
১৫. Phosphorus — ফসফরাস
মেরুদণ্ডে জ্বালা, স্পর্শে ব্যথা, হাত-পায়ে অসাড়তা; সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা ঝাপসা দৃষ্টি থাকতে পারে।
১৬. Physostigma — ফাইসোস্টিগমা
মেরুদণ্ডে শক্তভাব ও ব্যথার সঙ্গে পক্ষাঘাত বা খিঁচুনি; ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা বসতে কষ্ট।
১৭. Picric acid — পিক্রিক অ্যাসিড
পায়ে ঝিনঝিন ও দুর্বলতা, দাঁড়াতে কষ্ট এবং বিশেষ যৌন উপসর্গের সঙ্গে স্নায়বিক দুর্বলতার লক্ষণ।
১৮. Secale cornutum — সিকেলি
হাত-পায়ে ঝিনঝিন, খিঁচুনি, ঝাঁকুনি বা বিদ্যুৎ-চমকের মতো অনুভূতি; মূত্রথলি ও মলত্যাগের দুর্বলতার সঙ্গে।
১৯. Stramonium — স্ট্রামোনিয়াম
মেরুদণ্ডে ব্যথা ও অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা, অন্ধকারে চলতে অসুবিধা, হাত-পায়ে কম্পন বা দুর্বলতা।
২০. Sulphur — সালফার
দুই স্ক্যাপুলার মাঝখানে জ্বালা ও টানটান ব্যথা, কোমরে দুর্বলতা এবং মূত্ররোধের প্রবণতার সঙ্গে অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ।
২১. Tarentula hispanica — ট্যারেন্টুলা
মেরুদণ্ড অতিরিক্ত সংবেদনশীল; সামান্য স্পর্শেই তীব্র ব্যথা, জ্বালা ও অস্থিরতার মতো লক্ষণ।
২২. Zincum metallicum — জিঙ্কাম মেটালিকাম
কোমর ও মেরুদণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী তীব্র ব্যথা; বসলে বাড়ে, দাঁড়ালে আরাম। মেরুদণ্ডে জ্বালাযুক্ত ব্যথার সঙ্গে উদ্বেগ বা হৃদস্পন্দন থাকতে পারে।

ঔষধ নির্বাচনের সময় যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
মায়েলাইটিসের মতো জটিল স্নায়বিক সমস্যায় শুধু রোগের নাম দেখে কোনো একটি ঔষধ নির্বাচন করা উচিত নয়। রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষ্য করতে হবে—

• রোগটি হঠাৎ নাকি ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে
• জ্বর বা সংক্রমণের পর সমস্যা হয়েছে কি না
• আঘাতের কোনো ইতিহাস আছে কি না
• পিঠ বা কোমরের ব্যথার প্রকৃতি
• ব্যথা কোথায় এবং কোথায় ছড়িয়ে যায়
• নড়াচড়া, বিশ্রাম, চাপ, গরম বা ঠান্ডায় কী পরিবর্তন হয়
• হাত-পায়ে দুর্বলতা বা পক্ষাঘাত আছে কি না
• অসাড়তা বা ঝিনঝিন কোথায় হচ্ছে
• হাঁটা বা দাঁড়ানোর সমস্যা আছে কি না
• প্রস্রাব বা পায়খানার নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন হয়েছে কি না
• দৃষ্টি, কথা বলা বা গিলতে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না
• রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য

জরুরি সতর্কতা
মায়েলাইটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়বিক সমস্যা। হঠাৎ হাত-পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, হাঁটতে না পারা, প্রস্রাব আটকে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণ হারানো, মলত্যাগের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন, দ্রুত সংবেদন কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, দৃষ্টি বা কথা বলার নতুন সমস্যা ইত্যাদি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতাল বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

প্রয়োজনে চিকিৎসক MRI, রক্ত পরীক্ষা, স্নায়বিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। কারণ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করা উচিত নয়।
নিজে নিজে ওষুধ সেবন করবেন না
উপরের এই ঔষধের লক্ষণগুলো শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। মায়েলাইটিস সন্দেহ হলে শুধুমাত্র রোগের নাম দেখে বা এই তালিকা দেখে নিজে নিজে কোনো ঔষধ নির্বাচন করা উচিত নয়।
রোগীর পূর্ণ কেস গ্রহণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। গুরুতর বা দ্রুত বাড়তে থাকা স্নায়বিক উপসর্গ থাকলে জরুরি চিকিৎসা গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

উপসংহার
মায়েলাইটিসকে সাধারণ পিঠের ব্যথা বা মেরুদণ্ডের “হাড় ক্ষয়” হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এটি মেরুরজ্জুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদাহজনিত সমস্যা, যার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
হোমিওপ্যাথিক Materia Medica-তে মেরুদণ্ড ও মেরুরজ্জু-সম্পর্কিত বিভিন্ন লক্ষণের সঙ্গে একাধিক ঔষধের বর্ণনা রয়েছে। তাই রোগীর স্বতন্ত্র লক্ষণ, Modalities এবং সম্পূর্ণ রোগচিত্র বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করাই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক 
ডা. ইয়াকুব আলী সরকার

DHMS, MSS (Political science)
 Government Registered Homeopathic Doctor
সভাপতি- বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম (BOHF)
ইভা হোমিও হল
বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫১৪৮৮
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬