বুধবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৭

হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন শ্রমসাধ‍্য ব‍্যাপার।

ডা.হ্যানিম্যানের মতে, সুনির্বাচিত ঔষধটি বিনাআয়াসে বা বিনা প্রচেষ্টায় আপনাআপনি উড়ে এসে মুখের মধ্যে পড়বেনা।আদর্শ আরোগ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে রোগীর জন্য যথাযথ একটি ঔষধ (প্রকৃত সিমিলিমাম) অনুসন্ধান এবং নির্বাচনের জন্য একজন চিকিত্সককে সম্ভাব্য সবধরণের সর্বোত্তম পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে জানতে হবে এবং বাস্তবতার নিরিখে সে পদ্ধতিগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে ঔষধ নির্বাচনে ব্রতী হতে হবে।

এবার ঔষধ নির্বাচনের কিছু

কৌশল বা পদ্ধতি নিয়ে নিচে আলোচনা করছি-

১) বনিং হাউসেন মেথড।

২) সেগালের মাইন্ড টেনিক।

৩) রাজন শংকরণের সেনসেশন মেথড।

৪) জন সলটেনের সিনথেটিক মেথড।

৫) জেন মেথড।

৬) ড্রেনেজ সিস্টেম।

৭) এডভান্স স্টেইজের চিন্তাধারা।

৮) ডাঃ স্টান যেভাবে ঔষধ নির্বাচন করতেন।

৯) প্রফুল্ল বিজয়াকারের একিউট প্রেসক্রাইবিং।

১০) কী নোট ভিত্তিক প্রেসক্রাইবিং।

১১) পোলারিটি এনালাইসিস।

১২) হ্যানিম্যানের দেখানো কৌশল।

বনিং হাউসেন মেথড :

এখানে লক্ষণের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায়

অর্থাৎ

লোকেশন

কজেশন

সেনসেশন

এবং

মডালিটিসকে প্রাধান্য দিয়ে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।

সেগালের মাইন্ড টেকনিক :

এ পদ্ধতিটি বর্তমানে খুবই জনপ্রিয় এবং কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট পেতে যথোপোযুক্ত ঔষধ সিলেকশনে খুবই দরকারি একটি পদ্ধতি।

এ পদ্ধতিতে রোগীর আচার আচরণ,অঙ্গভঙ্গী,স্বভাব,কথাবলার ধরণ,স্বরের উঠানামা,বডি ল্যাংগুয়েজ ইত্যাদি বিষয়গুলো চিকিৎসক সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করে যথোপোযুক্ত রুব্রিক চয়ন করে রেপার্টরাইজেশন করে উপযুক্ত ঔষধটি নির্বাচন করে থাকেন।

প্রকৃতপক্ষে এ পদ্ধতিটিকে মানসিক লক্ষণকে ব্যবহার করার একটি এপ্লাইড রূপ বলা চলে।

মূলত এ পদ্ধতিতে ঔষধ নির্বাচনের জন্য চিকিৎসক রোগীর তিনটি বিষয়কে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন।এগুলোকে সংক্ষেপে "ট্রিপল পি" বলা হয়।বিষয়গুলো হচ্ছে -

P=প্রেজেন্ট বা বর্তমান লক্ষণ।

P=পারসিস্টিং বা পুন:পুন: বা বারবার দেখা দেয় এমন লক্ষণ।

P=প্রোডোমিনেটিং বা তীব্রতা সহকারে দেখা দিচ্ছে এমন লক্ষণ।

অর্থাৎ যে মানসিক লক্ষণগুলো বর্তমানে রোগীর মধ্যে দেখব,যে মানসিক লক্ষণগুলো রোগীর আচার আচরণে বারবার দেখা যাবে এবং যে মানসিক লক্ষণগুলো রোগীর মধ্যে তীব্রভাবে বিরাজ করবে সে ধরণের মানসিক লক্ষণগুলোকে প্রাধান্য দিয়েই ঔষধ নির্বাচন করতে হবে।

এভাবে ঔষধ নির্বাচন করে প্রয়োগ করলে রোগীর

দেহের চর্ম, নাক,মুখ,কান,মলদ্বার অথবা মূত্রদ্বার দিয়ে ক্ষরণ বাড়বে এবং টক্সিন বেরিয়ে গিয়ে রোগী সুস্থ হয়ে যাবে।

রাজন শংকরণের সেনসেশন মেথড :

এ পদ্ধতিতে ভাইটাল সেনসেশনকে প্রাধান্য দেওয়া

হয়।এটি এমন এক ধরণের লক্ষণ যেটি রোগীর দৈহিক,মানসিক এবং প্রধান সমস্যার মধ্যেও উপস্থিত থাকে।রোগী যেটি অনুভব করেন সেটি নির্ণয় করে চার্টের সাথে মিলিয়ে দেখা হয় রোগীর অনুভূতিটি কোন স্তরে অবস্থান করছে সেটি।রাজন শংকরণ অনুভূতির স্তরগুলোকে ৭-টি ভাগে ভাগ করেছেন।রোগীর অনুভূতি নির্ণয় হয়ে গেলে মায়াজম নির্ণয় করতে হয়।তারপর

বের করতে হয় ঔষধটি কোন জগতের,তারপর গোত্রের,বর্গের সবশেষে মূল উৎসটির।এভাবে ধাপে ধাপে সেনসেশন পদ্ধতিতে একমাত্র সিমিলিমামটি খুব সহজে বের করা যায়।

জন সলটেনের সিনথেটিক মেথড :

এ পদ্ধতিটির প্রচলন করেন নেদারল্যান্ডের ডাক্টার জন সলটেন।তিনি পিরিওডিক টেবলের মৌলগুলোর সাথে হোমিওপ্যাথিক ঔষধের অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তুর একটি পরম্পরা উদ্ভাবন করেছেন।যেটিকে চিকিৎসা কাজে ঔষধ নির্বাচনে ব্যবহার করা যায়।

জেন মেথড :

এ পদ্ধতিতে রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে ঔষধের পাশাপাশি পথ্যের দিকেও জোড় দেওয়া হয়।সেটি হতে পারে পুষ্টিকর খাবার বা অভাবের স্বভাব পূরণ করে এমন ধরণের বায়োকেমিক বা মাদার টিংচার খেতে দেওয়া।

ড্রেইনজের সিস্টেম :

বর্তমানে রোগীদের দেহে বিষাক্ততার মাত্রা খুবই বেশি।চিকিৎসার শুরুতেই রোগীর দেহ থেকে বিষক্ততা দূর করে নিলে অনেক ধরণের সুবিধা পাওয়া যায়।ফলে পরবর্তীতে রোগীদের মধ্যে এগ্রেভেশনও কম দেখা যায়।

আরোগ্য প্রক্রিয়াও দ্রুত হয়।উদাহরণস্বরূপ,হ্যানিম্যান এন্টিসোরিক চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে নাক্স প্রয়োগের কথা বলেছেন।এটি একধরণের ড্রেইনেজ পদ্ধতি।কেউ মত দিয়েছেন শারীরতত্ত্বীয় ক্রিয়ার দিক থেকে কোন বিশেষ অঙ্গের ঔষধ হিসাবে পরিচিত ওষুধগুলোকে ড্রেইনেজ বা নিষ্কাশন ক্রিয়া ঘটানোর জন্য ব্যবহার করতে।রাজন শংকরণের মতে,হোমিওপ্যাথিক ঔষধ গ্রহণে রোগীর দেহের স্রাব বেড়ে গিয়ে বা স্রাব দেখা দিয়ে

রোগীর অবস্থার উন্নতি হতে দেখা যায়।ডা সেগালও তার কেসগুলোকে ক্ষরণ দেখিয়েছেন এবং ঔষধের যথার্থ ক্রিয়াশীলতার মানদন্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এন্ডভান্স স্টেইজের চিন্তাধারা :

এডভান্স স্টেইজে অনেক সময় যখন লক্ষণগুলো স্পষ্ট পাওয়া যায় না তখন অনেক সময় স্পেয়ার অফ একশেনের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচনের কথা বলা হয়ে থাকে।

ডাঃ স্টান যেভাবে ঔষধ নির্বাচন করতেন :

ডাঃ স্টান মাত্র চার থেকে পাচটি লক্ষন নিতেন। ১) একটি প্যাথোলজিক্যাল ২) একটি অব্জেক্টিভ ৩)একটি মানসিক ও ৪) দুটি সার্বদৈহিক।

পদ্ধতিটি অনেকক্ষেত্রে কার্যকরী হলেও সর্বাবস্থায় কার্যকরী বলা যাবেনা।ক্রণিক কেইসে এত সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি অবলম্বন না করে আরো বিশদ পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত।

প্রফুল্ল বিজয়াকারের একিউট প্রেসক্রাইবিং :

এ পদ্ধতিতে প্রথমেই রোগীর নিম্নোক্ত ৩ টি অবস্থার মধ্যে রোগীর মধ্যে কোনটি দেখা যাচ্ছে সেটি নির্ণয় করা হয়।এগুলো হচ্ছে -

অসুস্থ হওয়ার পর থেকে ১) রোগী শান্ত হয়ে গেছে (কর্ম তৎপরতার হ্রাস),২)অস্থির হয়ে পড়েছে (কর্ম তৎপরতার

বৃদ্ধি ), ৩) কোন পরিবর্তন আসেনি।

এরপর নিদ্রাকাতর বা অলস হয়ে পড়েছে কিনা।রোগীর কাতরতা, পিপাসাহীন বা পিপাসার্ত কিনা এই বিষয়গুলো যুক্ত করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।

কী নোটভিত্তিক প্রেসক্রাইবিং :

ঔষধের ব্যাপকতার জন্য নির্বাচনের সুবিধার্থে প্রধান বিষয়বস্তুগুলোকে একত্রিত করে কী নোট তৈরি হয়ে থাকে যেগুলোর ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন করা সুবিধাজনক হয়ে দাঁড়ায়।যেমন ধরুণ, হঠাৎ আক্রমণ,প্রচন্ড মৃত্যুভয়,অত্যন্ত পানির পিপাসা।ঔষধ হবে.....।

কুকুরভীতি,বজ্রপাতের সময় খিচুনি শুরু হয়,ঠান্ডা বরফ খেতে চায়।ঔষধটি হল......।

ভ্রমণশীল ব্যথা।ব্যথার স্থান অল্প পরিসর জুড়ে।স্থানটি আঙুলের ডগার সমান।ঔষধ হল.......।

পোলারিটি এনালাইসিস :

এ পদ্ধতিতে বোনিংহাউসেন পদ্ধতির চারটির একটি পিলার হ্রাস বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দিয়ে ঔষধ নির্বাচন করা হয়ে থাকে।

হ‍্যানিম‍্যানের দেখানো কৌশল :

উপরে বর্ণিত সবগুলো পদ্ধতি মূলত হ‍্যানিম‍্যানের দেখানো পদ্ধতির বিবর্ধিত ও বিকশিত রূপ।

এ পদ্ধতিতে টোটালিটি অফ সিম্পটমকে প্রাধান‍্য দেওয়া হয়।রোগীর বর্তমান,অতীত,বংশ,

মানসিক,সার্বদৈহিক অবস্থার রোগীলিপি তৈরি করে সেটিকে এনালাইসিস করা হয়।এনালাইসিসে এক্সাইটিং কজ, মানসিক অবস্থা, কনিস্টিউশন, মায়াজম, আনকমন প্রিকুলার লক্ষণ এগুলোকে প্রাধান‍্য দিয়ে প্রয়োজনে রেপার্টরীর সহায়তা নিয়ে এনামনেসিসের মাধ‍্যমে একক ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
লেখক : ডা. ফায়েক এনাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন