রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

মৃগীরোগ ( Epilepsy )এর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা



 মৃগীরোগ ( Epilepsy ) –এর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

মৃগীরোগ বা অপম্মার বা এপিলেপ্সী একটি দীর্ঘকাল স্থায়ী স্নায়বিক ব্যাধি । ইহাতে মধ্যে মধ্যে আক্ষেপসহ অথবা বিনা আক্ষেপেই রোগী সহসা অজ্ঞান হইয়া পড়ে । মস্তিস্কের ঊর্ধ্বতন কেন্দ্রসমূহের ক্রিয়া সহসা বিপর্যস্ত হইয়া পড়িলে স্নায়ুতন্ত্রের ( nervous system ) অন্যান্য অংশের ক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হইয়া লক্ষণাদি প্রকাশ করে । ইহার প্রতি আক্রমণ স্বল্পক্ষণস্থায়ী এবং মধ্যবর্তী কালে রোগী একরূপ সুস্থই থাকে – অন্ততপক্ষে এই রোগের বিশিষ্ট কোন লক্ষণাদি বর্তমান থাকে না।

কারণ-তত্ত্ব > পিতৃমাতৃকুলে এই পীড়ার ইতিহাস অথবা উম্মাদরোগ, মদ্যপান, অতিশয় ভাবপ্রবণতা, প্রভৃতির পরিচয় পাওয়া যাইতে পারে । মস্তকে আঘাত, মস্তিস্ক মধ্যে রক্তস্রাব, থ্রাম্বোসিস, এম্বোলিজম, গুল্ম, প্রভৃতির চাপ, মদ্যাদি মাদক দ্রব্য সেবন, অথবা কোকেন, ষ্ট্রীকনিয়া, আর্সেনিক, সীসক, প্রভৃতির বিষক্রিয়া, সংক্রামক পীড়াদি অথবা রিকেটস, ইউরিমিয়া, উপদংশ, হস্তমৈথুন ক্রিয়ার কুফল, প্রভৃতিতে এই রোগের কারণ রূপে নির্দেশ করা যাইতে পারে । ভয় শারীরিক ও মানসিক অবসাদ বা শৈশবে মেনিঞ্জাইটিস, প্রভৃতি মস্তিস্কের রোগ হইতে মৃগীরোগের সূচনা হইতে পারে।

ইহাতে সকল বয়সেই স্ত্রীপুরুষ সকলেই সমভাবে আক্রান্ত হইতে পারে, কিন্তু দশম হইতে বিংশতি বৎসর বয়সমধ্যে বিশেষতঃ যৌবনসমাগমে ইহার প্রবণতা সর্বাধিক । নুন্যাধ্যিক সময়ান্তর দিবাভাগে, রাত্রিকালে অথবা প্রতি মাসে স্ত্রীলোকদিগের ঋতুসহ ইহার আক্রমণ হইতে পারে।

প্রকার ভেদ


ইহা প্রধানতঃ দুই জাতীয় । লঘু মৃগী বা পেটিট মাল ( Petit mal ) ও গুরু মৃগী বা গ্র্যান্ড মাল ( grand mal )।

পেটিট মাল

ইহাতে ক্ষণস্থায়ী অজ্ঞানতা বা অজ্ঞান ভাব উপস্থিত হয় । মূর্ছা কখন হয়, কখন হয় না । রোগী কথা বলিতে বলিতে বা কোন কাজ করিতে করিতে স্থির হইয়া এক দৃষ্টে তাকাইয়া থাকে, তাহার মুখমণ্ডল বিবর্ণ ও রক্তশূন্য হয়, হাতে কোন দ্রব্য থাকিলে তাহা পড়িয়া যায় এবং এইরূপ অবস্থায় স্বল্পক্ষণ থাকিয়া পুনরায় সুস্থভাবে পূর্ব কার্য আরম্ভ করে । কেহ কেহ মস্তক অবনত করিয়া হঠাৎ মেঝের উপর পড়িয়া যায় অথবা কেবল হেঁটমুণ্ডে বসিয়া থাকে । কেহ কেহ হঠাৎ অসংলগ্ন বাক্য বা তোতলামি করিয়াই অথবা জামাকাপড় খুলিয়া বা নিকটস্থ দ্রব্যাদি ছিঁড়িয়া বা ভাঙ্গিয়া সুস্থ হয় । কাহারও বা দমবন্ধ ভাব প্রকাশ পায় । ক্ষণস্থায়ী ও মৃদু হইলেও শিরোঘূর্ণন ও মূর্ছা প্রায়ই হয় এবং বহুক্ষেত্রে ইহা হইতেই পরিণামে গ্র্যান্ড মাল বা গুরু মৃগী হয় ।

গ্র্যান্ড মাল

ফিট হইবার কিছুকাল পূর্ব হইতে অস্থিরতা, অক্ষুধা, মাথাব্যথা, উদ্যমহীনতা, নিদ্রালুতা, প্রভৃতি কতকগুলি লক্ষণ উপস্থিত হয় । ইহাদিগকে পূর্বাভাস প্রদায়ক লক্ষণ ( Premonitory signs ) বলে । আক্রমণের অব্যবহিত পূর্বে শরীরের কোন স্থানে বিশেষ অনুভুতি দ্বারা রোগী আক্রমণের বা ফিটের সূচনা বুঝিতে পারে । ইহাকে অরা ( aura ) বলে । অঙ্গুলি বা অঙ্গ বিশেষের কম্পন ঝিন ঝিন করা, সূচীবিদ্ধবৎ অনুভুতি, নানাপ্রকার শব্দ শ্রবণ বা কম শোনা, বিকট গন্ধ, বিকৃত স্বাদ, ঝাপসা দৃষ্টি বা নানারূপ আলোক দর্শন, উদরে বা হৃৎপিণ্ডে অব্যক্ত যন্ত্রণা, বুক ধড়ফড়ানি, এক অঙ্গ নর্তন, মস্তক সঞ্চালন, বমন, শ্বাসকষ্ট, প্রভৃতি অরা রূপে প্রকাশ পায় । অরা প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগী প্রায়ই উচ্চ চিৎকার করিয়া ফিট হইয়া অজ্ঞান হইয়া পড়ে ।

মৃগীজনিত ফিটের তিন অবস্থা দেখা যায় । যথা

( ক ) – টনিক স্প্যাজম বা টনিক ফেজ ( Tonic spasm or tonic phase ) মুখ, স্কন্ধদেশ ও চক্ষু হইতে আরম্ভ হইয়া সর্বশরীরের কাঠিন্য ও আড়ষ্ট ভাব উপস্থিত হয়, হস্তদ্বয় মুষ্টিবদ্ধ ও দ্বিভাঁজ ও পদদ্বয় প্রসারিত থাকে এবং মাথা পশ্চাদদিকে বাঁকিয়া সর্বশরীর ধনুকের ন্যায় আকার ধারণ করে ( opisthotonos ) ; শ্বাসযন্ত্রের পেশী সমূহের আক্ষেপ বশতঃ শ্বাস-প্রশ্বাস স্তদ্ধ হইয়া দেহ নীল বর্ণ ধারণ করে এবং চক্ষু উপর দিকে অথবা এক কোণে উঠিয়া যায় । এই অবস্থা এত সত্বর সংঘটিত হয় যে রোগী, কোন নিরাপদ স্থানে উপস্থিত হইয়া আত্মরক্ষা করিবার অবসর পায় না । ইহার কয়েক সেকেন্ড মধ্যেই দ্বিতীয় অবস্থা উপস্থিত হয় ।

( খ ) ক্লোনিক স্প্যাজম বা ক্লোনিক ফেজ ( Clonic spasm or clonic phase ) টনিক ফেজের কয়েক সেকেন্ড মধ্যেই পেশীসমূহের প্লথন ( Relaxation ) উপস্থিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র পেশীচক্রে খিঁচুনি ( cramps ) আরম্ভ হয় । মুখের পেশীর আক্ষেপ হইতে থাকে, চক্ষুগোলক ঘুরিতে থাকে, চোখের পাতা ঘন ঘন মুদ্রিত ও উম্মিলিত হইতে থাকে, চোয়ালের খিঁচুনি হইয়া মুখ বীভৎস দেখায় ও দাঁত ঠকঠক করে । ( এই সময় জিহ্বা কাটিয়া যাইতে পারে ) । হাতপা জোরে ছুঁড়িতে থাকে এবং সমগ্র শরীর ভীষণভাবে মোচড় খাইতে থাকে । মুখ দিয়া ফেনা নির্গত হয় এবং কখনো তাহা রক্তমিশ্রিত হয় । অসাড়ে মলমুত্র নিঃসরণ হয় । এইরূপ কয়েক মিনিট চলিবার পর ধীরে ধীরে আক্ষেপ হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং দীর্ঘ ঘড়ঘড়ানি শ্বাস লইয়া রোগী স্থির হইয়া পড়ে ও তৃতীয় অবস্থা উপস্থিত হয়।

( গ ) – কোমা বা অজ্ঞান অবস্থা ( Comatic phase ) ক্লোনিক ফেজের পর হাত পা শিথিল হয়, মুখের বর্ণ স্বাভাবিক হয় এবং রোগী অবসন্ন হইয়া গভীর নিদ্রাভিভুত হয় । ডাকিলেই তাহার সাড়া পাওয়া যায়, কিন্তু না ডাকিলে, কিছুক্ষণ শান্তভাবে নিদ্রা যায় । গুরুতর আক্রমণের ফলে নানাস্থানে রক্ত জমিতে (ecchymoses ) দেখা যায়, অস্থিভঙ্গ (fracture) বা সন্ধির স্থানচ্যুতি (dislocation) হইতে পারে

ষ্টেটাস এপিলেপ্টিকাস ( status epilepticus ) – কখনো কখনো স্বল্প বিরাম সহ ক্রমাগত ফিট হইতে থাকে – রোগী জ্ঞান লাভ করিবার সুযোগ পায় না । নাড়ী ও শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়, গাত্রতাপ প্রায়ই অস্বাভাবিক রূপে এমন কি ১০৮ ডিগ্রি কিংবা ততোধিক বৃদ্ধি পায় এবং রোগী নিতান্ত অবসন্ন হইয়া পড়ে । এই অবস্থায় মৃত্যু হইতে পারে ।

পোস্ট- এপিলেপ্টিক ফেজ ( post-epileptic phase্ ফিট ও কোমার পরে নিদ্রাভঙ্গে মাথাব্যথা, বমন, অবসন্নতা ও নিস্তেজতা এবং কখনও কখনও আক্রান্ত পেশীসমূহের আড়ষ্টতা বোধ হয় । কেহ কেহ অসংলগ্ন ভাবে উম্মাদের ন্যায় আচরণ করিতে থাকে । সুস্থ হইলে এ সকল বিষয়ের কথা রোগীর স্মরণ থাকে না ।

জ্যাকসোনিয়ান এপিলেপ্সী ( Jacksonian epilepsy ) শরীরের যে কোন স্থানের পেশী হইতে আক্ষেপ আরম্ভ

হইয়া তৎস্থানে সীমাবদ্ধ ( Localised ) থাকে, অথবা সর্বশরীর বিস্তৃত হয়, ইহাতে সাধারণতঃ জ্ঞানহারা হয় না।

রোগের কুফল – দীর্ঘকাল ধরিয়া মধ্যে মধ্যে আক্রমণ হইতে থাকিলে অবশেষে মানসিক বিপর্যয় ( Dementia ) দেখা দিতে পারে।

রোগের পার্থক্য নির্ণয় ( Differential diagnosis ) – টিটেনাস বা ধনুষ্টঙ্কার রোগে রোগী আদৌ জ্ঞানহারা হয় না এবং আক্ষেপের বিভিন্ন অবস্থা ( phase ) থাকে না, টনিক স্প্যাজমই ইহার বিশেষত্ব।

হিষ্টিরিয়া

ইহার প্রতি আক্রমণ প্রায়ই দীর্ঘকালস্থায়ী হয় এবং মৃগীর ন্যায় ঘুমের মধ্যে কোন আক্রমণ হয় না, অথবা রোগী আত্মরক্ষা করিবার কোন চেষ্টা না করিয়া হঠাৎ অসহায় ভাবে যেখানে সেখানে জ্ঞানহারা হইয়া পড়িয়া গিয়া আহত হয় না । ক্লোনিক স্প্যাজম, নানা ভঙ্গীতে হাত পা ছোঁড়া ও ফিট হইবার পরে চিৎকার, হিষ্টিরিয়ার বৈশিষ্ট্য। রোগী বাধা পাইলে বলপ্রকাশ করে এবং আপন জিহ্বা দংশন করে না, বরং অপরকে কামড় দিতে পারে ; অসাড়ে মলমুত্র ত্যাগ করে না, ফিটের পর কোমা উপস্থিত হয় না এবং গাত্রতাপ প্রায়ই স্বাভাবিক বা নর্মাল থাকে।

ভাবী ফল – পেটিট মাল বয়োবৃদ্ধি হইলে প্রায়ই আরোগ্য হয় । গ্র্যান্ডমালে সুচিকিৎসায় রোগাক্রমণের ব্যবধান দীর্ঘতর এবং আক্রমণ স্বল্পতর ক্ষণস্থায়ী হইলেও সম্পূর্ণ আরোগ্য সন্দেহস্থল । জলে, অগ্নিতে বা উচ্চস্থান হইতে পড়িয়া না গেলে ইহাতে মৃত্যু হয় না । কিন্তু অধিককাল স্থায়ী হইলে মানসিক অবসাদ ঘটিতে পারে ।

চিকিৎসা

সাধারণ স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য পুষ্টিকর আহার ও বায়ু পরিবর্তন বিধেয় । রোগী নিয়মিত কার্যাদি করিতে পারে, তবে সাতার কাটা, গাড়ী চালানো, সাইকেল চড়া, উচ্চস্থানে কাজ করা বা শিশুদের অধিক পড়াশুনা করা আদৌ উচিৎ নহে । মদ্যাদি সর্বদা বর্জনীয় । কেহ কেহ বিবাহ নিষেধ করেন, কিন্তু তাহার বিশেষ প্রয়োজন মনে হয় না । ফিট হইলে রোগীকে উপযুক্ত স্থানে আনয়ন করিয়া তাহার পরিধেয় বস্ত্রাদি ঢিলা করিয়া দাঁতের মধ্যে একটি প্যাড প্রবেশ করাইয়া দিতে হয় । চোখে মুখে শীতল জলের ঝাপটা ও মাথায় জল ঢালা বিধেয় । রোগীকে চাপিয়া ধরা উচিৎ নয় । স্মেলিং সল্ট অথবা কয়েক বিন্দু ক্লোরোফরম অথবা এমিল নাইট্রেট – মুল অরিষ্ট ঘ্রান করাইলে শীঘ্র জ্ঞান ফিরিয়া আসে

মৃগী রোগীর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ব‍্যবহৃত সদৃশ ঔষধ নির্বাচন গাইড

অ্যাবসিন্থিয়াম

ইহাতে মৃগীজনিত ফিট-এর পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় । আক্রমণের পূর্বে সর্বশরীর কাঁপিতে থাকে ও নানাপ্রকার কাল্পনিক মূর্তি দেখিতে পায় । ফিট হইলে মুখাবয়ব লাল হয়, মুখের পেশীর আক্ষেপ হয়, জিহ্বা দংশন করে, এবং চক্ষুতারকা অসমানভাবে বিস্ফারিত হয় । ফিটের পর রোগী বিহ্বল হইয়া থাকে । ইহা মৃগীজনিত মাথা ঘোরা বা ক্ষণস্থায়ী অজ্ঞানতায় উপযোগী । আক্ষেপকালে অতিশয় অস্থিরতা ।

আর্টিমিসিয়া ভাগ্লারিস

ইহা ভয় বা মানসিক উত্তেজনা অথবা হস্তমৈথুন জনিত রোগের আক্রমণে উপযোগী । ইহা অরা বিহীন পেটিট মালের বিশিষ্ট ঔষধ । রোগী মাত্র কয়েক সেকেন্ড অজ্ঞান হইয়া থাকিবার পর সুস্থ হয়, যেন কিছুই ঘটে নাই । কখনও বা ঘন ঘন ফিট হইতে থাকে ( সিকেলি ) ।

আর্জেন্টাম মেট

আক্রমণের পর রোগী বিকারসহ অত্যধিক ক্রোধ প্রকাশ করিলে ইহা ফলপ্রদ, রোগী চতুর্দিকে লাফাইতে থাকে ও নিকটে কেহ থাকিলে তাহাকে প্রহার করে ।

আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম

ভয় পাইয়া অথবা মাসিক ঋতুসহ মৃগীর আক্রমণ ইহার বিশেষত্ব । আক্রমণের পূর্ব হইতেই চক্ষুতারকা বিস্তৃত হয় । ফিটের পর অত্যধিক অস্থিরতা প্রকাশ পায় ও হস্তদ্বয় কাঁপিতে থাকে । রোগীর মন অত্যন্ত দুর্বল, সহজেই ভয় পায় ও হতাশ হয় ।

আর্সেনিক এল্বাম আক্রমণের পূর্বে মাথা ঘোরে ও মাথার পিছনে তীব্র যন্ত্রণা হয়, কখনও বা উত্তপ্ত বায়ু মেরুদণ্ড বাহিয়া মাথায় উঠিতেছে বলিয়া মনে হয় । রোগী অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া যায় ও প্রবল আক্ষেপ হইয়া তাহার সর্বশরীর মোচড়াইতে থাকে । আক্ষেপের পর তন্দ্রাভিভুত হয়, কিন্তু তন্মধ্যেও অত্যধিক অস্থিরতা প্রকাশ পায় । ফিটের পরে বিহ্বল হইয়া থাকে ।

বেলেডোনা

মৃগী রোগের তরুণ আক্রমণ ইহা দ্বারা সহজেই প্রশমিত হয় এবং কখনও বা রোগারোগ্যও হইয়া থাকে । ইহা বিশেষতঃ তরুণদিগের পক্ষেই উপযোগী । আক্রমণের পূর্বে ও সময়ে মুখমণ্ডলের আরক্তিমতা, কেরটিড ধমনীর উপ্লস্ফন, প্রভৃতি মস্তিস্কে রক্তাধিক্যের লক্ষণাদি প্রকাশ পায় । আক্রমণের পূর্বে মনে হয় যেন প্রত্যঙ্গাদি বাহিয়া মূষিক দৌড়াইতেছে বা পাকস্থলী হইতে উত্তাপ উঠিতেছে । অলীক শ্রবণ ও দর্শন হয় । ফিট হইলে বাহু হইতে আক্ষেপ আরম্ভ হইয়া চোখ মুখে বিস্তৃত হইয়া পড়ে । সুস্থকালে স্নায়বিক উত্তেজনাবশতঃ সহজেই নিদ্রায় ব্যাঘাত, নিদ্রা-মধ্যে চমকিয়া ওঠা, পেশীগুলির নর্তন ও কম্পন, প্রভৃতি বর্তমান থাকিলে ইহা অধিকতর উপযোগী । কখনও বা রোগী অত্যধিক ক্রোধ প্রকাশ ও রাগারাগি করে । কেহ কেহ ইহার পরিবর্তে এট্রোপিন ব্যবহার করেন ।

বিউফো রানা

ভয়, অত্যধিক ইন্দ্রিয় সেবা এবং বিশেষতঃ হস্ত-মৈথুন জনিত এপিলেন্সী । রোগী হস্তমৈথুন করিবার জন্য গুপ্তস্থান অনুসন্ধান করে । ইহার অরা জননেন্দ্রিয় অথবা সোলার প্লেক্সাস হইতে আরম্ভ হয় এবং কখনও কখনও হস্তমৈথুন বা স্ত্রী সহবাস করিতে করিতেই আক্ষেপ আরম্ভ হয় । আক্ষেপের পূর্বে রোগী অসংলগ্ন কথা বলিতে থাকে এবং তাহা বুঝিতে না পারিলে বিরক্ত হয় । আক্ষেপ হইলে ঊর্ধ্বাঙ্গ হইতে নিম্নাঙ্গ অধিক বিক্ষিপ্ত হয় এবং মুখমণ্ডলে প্রভূত ঘর্ম হয় । ফিটের পর রোগী গভীর নিদ্রাভিভুত হইয়া পড়ে ।

ক্যাল্কেরিয়া কার্ব

ভয়, অত্যধিক স্ত্রীসঙ্গম অথবা পুরাতন চর্মরোগ লুপ্ত হইয়া মৃগী রোগে, বিশেষতঃ পূর্ণিমা তিথিতে, বিরক্তি, অথবা শীতল জল পান বা বসিয়া পা দোলাইয়া আক্রমণের সূচনা হইলে ইহা উপযোগী । ইহার অরা উদরমধ্যস্থ স্নায়ুমণ্ডলী বা সোলার প্লেক্সস হইতে আরম্ভ হইয়া আক্ষেপের সূচনা হয় ( নাক্স, বিউফো, সাইলি ); কখনও মনে হয় যেন হাত বাহিয়া মূষিক উঠিতেছে ( বেলেডোনা, সালফার ); অরা উদরমধ্য হইতে জরায়ু বা হস্ত পদাদিতে উপস্থিত হয় । ক্যাল্কেরিয়া ধাতুগত মৃগীরোগপ্রবন, এজন্য মৃগীরোগের মূলোৎপাটন করিবার জন্য ইহা বিশেষ উপযোগী । ইহা সালফারের আরম্ভ কার্য সম্পূর্ণ করিয়া

থাকে।

কষ্টিকাম

পেটিট মালে ইহা বিশেষ উপযোগী । রোগী চলিতে চলিতে হঠাৎ অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া যায় । যুবক বয়সে রোগের উৎপত্তি ও পূর্ণিমা তিথিতে আক্রমণ এবং অধিকাংশ সময়ে ঋতুর গোলমাল ইহার বৈশিষ্ট্য । এ ক্ষেত্রে ইহা ক্যাল্কেরিয়ার সমধর্মী ; কিন্তু ক্যাল্কেরিয়ায় শীতল জল পানে রোগের আক্রমণ হয় – কষ্টিকামে শীতল জল পানে আক্রমণ প্রতিরুদ্ধ হয় । রোগী অজ্ঞান অবস্থায় প্রস্রাব করে । আক্ষেপ কালে, পূর্বে বা পরে হাস্য করে । ( মাসিক ঋতুর নিকটবর্তী সময়ে বা তৎসহ মৃগীর ফিট – সিমিসি ; ঋতুরোধবশতঃ বা অত্যধিক বেদনাযুক্ত ঋতুসহ – ককিউলাস, জেলস )।

সাইকিউটা ভিরোসা

ইহাতে অজ্ঞান হইয়া রোগীর সর্বশরীর হঠাৎ কঠিন হয়, চক্ষু স্থির, মুখাবয়ব নিলাভ এবং মুখে ফেনা কাটে । তৎপর মস্তক হইতে সর্বশরীর প্রবলভাবে পুনঃপুনঃ ঝাঁকি দিতে থাকে, চোয়াল আটকাইয়া যায়, জিহ্বা কাটিয়া যায়, অপিস্থোটোনস হয়, হস্তপদাদি ভীষণভাবে মোচড়াইতে থাকে এবং রোগী অত্যন্ত অবসন্ন হইয়া পড়ে । ফিটের পর অত্যধিক অবসন্নতায় চিনি আর্স ইহার সমতুল্য । সামান্য স্পর্শেই টনিক স্প্যাজম বৃদ্ধি ( ষ্ট্রিকনিয়া, কিন্তু ইহাতে অজ্ঞানতা থাকে না )।

কুপ্রাম মেট

হাম, বিসর্প, প্রভৃতির উদ্ভেদ বসিয়া গিয়া বা দন্তোদ্গমকালে মৃগীর ফিট আরম্ভ হইলে ইহা উপযোগী । প্রচণ্ডভাবে আক্ষেপ হইতে থাকে, মুখমণ্ডল ও ওষ্ঠ নিলাভ হয়, চক্ষুদ্বয় ঘূর্ণায়মান ও মুখ হইতে ফেনা বাহির হয় । বিকারের প্রচণ্ডতায় ইহা বেলেডোনার সমতুল্য । উদর হইতে অরা আরম্ভ হয় এবং অজ্ঞান হইবার পূর্বে রোগী হস্ত ও পদাঙ্গুলির আক্ষেপ লক্ষ্য করিতে থাকে ; তৎপর সহসা তীব্র চীৎকার করিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়ে এবং তাহার ফ্লেক্সার পেশীর প্রচণ্ড আক্ষেপ হইতে থাকে । তৎকালে তাহার বৃদ্ধাঙ্গুলি মুষ্টিবদ্ধ থাকে ও দাঁত কড়মড় করে । ইহাতে ফিট দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ফিটের পর রোগী গভীর নিদ্রাভিভূত হইয়া পড়ে । রাত্রে নিদ্রাকালে ও বিশেষতঃ নির্দিষ্ট সময়ান্তর বা প্রতি ঋতুকালে ফিট হয় । কেহ কেহ ইহাতে মৃগীরোগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔষধ বলিয়া মনে করেন ।

হাইড্রোসায়েনিক অ্যাসিড

ডাঃ হিউজেস ইহাকে মৃগীরোগের অমোঘ বা স্পেসিফিক ঔষধ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন এবং ডাঃ ডিউই ইহার যথেষ্ট প্রশংসা করিয়াছেন। ইহাতে মৃগী রোগের অধিকাংশ লক্ষণাবলীই পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়। ফিটের পর রোগী অত্যধিক অবসন্ন ও নিদ্রালু হইয়া পড়ে। ডাঃ ফ্যারিংটনের মতে ইহা আক্রমণকালের একটি বিশিষ্ট ঔষধ।

হায়োসিয়ামাস

হিংসা, নিরাশ প্রেম, দুঃখ বা অত্যধিক ভয়জনিত মৃগীরোগ । বস্তুত ইহা মৃগীরোগের একটি বিশেষ নির্ভরযোগ্য ঔষধ । পূর্ব হইতে শরীরের পেশীর নর্তন ( Jerking and twitching ) ও অত্যধিক ক্ষুধা বোধ হয় । তড়কা উপস্থিত হইলেও পেশীর নর্তন সমভাবে চলিতে থাকে । রোগী চীৎকার করে, তাহার মুখমণ্ডল নীলাভ হয় ও দাঁত কড়মড় করে । তাহার মুখ হইতে ফেনা বাহির ও অসাড়ে মুত্রত্যাগ হয় । ফিট শেষ হইলে নাসিকাধ্বনিসহ গভীর নিদ্রাভুত হয় । জল পান করিবার চেষ্টা করিলেই পুনরাক্রমন ঘটে।

ইগ্নেসিয়া

ভয় বা রুদ্ধ শোকবশতঃ মৃগীবৎ আক্ষেপ । তিরস্কৃত হইবার পর শিশুর আক্ষেপ।

ইণ্ডিগো


অন্ত্রমধ্যে কৃমির উত্তেজনাবশতঃ মৃগীর ন্যায় আক্ষেপ । গুহ্যদ্বার ভীষণভাবে চুলকায় বলিয়া রাত্রে শিশুর নিদ্রা ভঙ্গ হয় অত্যধিক বিমর্ষ ও বিষণ্ণ ( বিউফো ও নাক্স – উগ্র ও খিটখিটে ) । এই অধিকারে ষ্ট্যানামও উল্লেখযোগ্য।

নাক্স ভমিকা

পরিপাকক্রিয়ার ব্যাঘাতজনিত রোগ, বিশেষতঃ যদি সোলার প্লেক্সাস হইতে আবির্ভাব হয় । উক্তস্থানে বেদনা বোধ হয় এবং তথায় চাপ দিলে পুনরাক্রমন ঘটে। কখনও বা মুখের উপর দিয়া পিপীলিকা চলিয়া বেড়াইতেছে এরূপ অনুভুতি । খিটখিটে ও উগ্র মেজাজ ; কোষ্ঠবদ্ধতা; প্রাতঃকালে শিরঃপীড়া ; অক্ষুধা ।

ইনাস্থি ক্রোকেটা

রোগী হঠাৎ গভীর অজ্ঞান হইয়া পড়ে ও তাহার চোয়াল আটকাইয়া যায় এবং হস্তপদাদি শীতল হয় ; মুখমণ্ডল স্ফীত ও নীলাভ এবং চক্ষুতারকা বিস্ফারিত ও অসমান হয় । মৃগীরোগে ডাঃ ডিউই, টেলকট, ডেভিডসন, প্রভৃতি শতমুখে ইহার প্রশংসা করিয়াছেন।

প্লাম্বাম মেট

আক্রমণের পূর্ব হইতেই পদদ্বয় পক্ষাঘাতবৎ ভারী বোধ হয় । ফিটের পর পক্ষাঘাত বর্তমান থাকে ও নাসিকাধ্বনিসহ গভীর নিদ্রা হয় । সম্পূর্ণ জ্ঞান লাভ হইতে বিলম্ব হয় । সেরিব্রাল স্ক্রেরোসিস বা টিউমারজনিত মৃগীরোগে ইহা বিশেষ কার্যকরী এবং মধ্যে মধ্যে উদর বেদনা ও দুর্দম্য কোষ্ঠকাঠিন্য ইহার বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে।

সাইলিসিয়া


ইহা মৃগীরোগের একটি বিশিষ্ট ঔষধ এবং স্ক্রুফুলা ও রিকেট ধাতুগ্রস্তদিগের পক্ষে বিশেষ উপযোগী । একাদশী, অমাবস্যা, প্রভৃতি তিথিতে এবং প্রায়ই রাত্রিকালে আক্রমণ হয় । মানসিক পরিশ্রম বা আবেগ ফিটের প্রবণতা বৃদ্ধি করে । সোলার প্লেক্সাস হইতে অরার আবির্ভাব হয় এবং বাম শরীরার্ধ অত্যধিক শীতল বোধ হয় । রোগী উৎকট চীৎকার করে গোঁ গোঁ শব্দ করে । তাহার চক্ষু হইতে জল পড়ে, মুখ হইতে ফেনা নির্গত হয় । ফিটের পর শরীর উষ্ণ ঘর্মাপ্লুত হয় এবং রোগী ঘুমাইয়া পড়ে । ইহা প্রায়ই ক্যাল্কেরিয়ার পর নির্দিষ্ট হয় । আক্রমণের পূর্বে বাম অঙ্গের শীতলতা ইহার বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে।

ষ্ট্যানাম মেট

অন্ত্রমধ্যে ক্রিমিজনিত বা জননেন্দ্রিয়সংশ্লিষ্ট মৃগীরোগে ব্যবহার্য। রোগীর মুখমণ্ডল মলিন; মধ্যে মধ্যে শূলবেদনা হয় এবং চলিয়া বেড়াইলে বা জোরে চাপ দিলে উপশম হয়। জিহ্বা হলুদবর্ণের লেপাবৃত; অত্যধিক দুর্বলতা।

ষ্ট্রামোনিয়াম

ভয়জনিত মৃগীরোগ ; রোগী সহসা অজ্ঞান হইয়া পড়ে ও ক্রমাগত মাথা ঝাঁকি দিয়া দক্ষিণ এবং বাম হস্ত চক্রাকারে ঘুরাইতে থাকে । রোগী আলোকে থাকিতে চায়, তাহার অন্ধকারে ভয় করে। বেলেডোনা ইহার বিপরীত

কেন্ট রেপার্টরির সাহায্যে মৃগী রোগীর সদৃশ ঔষধ নির্বাচন:

epileptiform : Acon., aeth., Agar., alum., am-c., anac., ant-c., ant-t., arg-m., Arg-n., arn., ars., asaf., aur., Bell., bry., bufo., calc-s., Calc., camph., canth., carb-s., Caust., cedr., cham., chin., Cic., Cina., cocc., coloc., con., Cupr., cur., dig., dros., dulc., ferr-ar., ferr., gels., Glon., hell., Hyos., hyper., ign., iod., ip., kali-br., kali-c., kali-s., lach., laur., led., lyc., mag-c., med., merc., mosch., mur-ac., nat-m., nit-ac., nux-m., nux-v., oena., op., petr., ph-ac., phos., plat., Plb., psor., puls., ran-b., ran-s., rhus-t., ruta., sec., sep., sil., stann., staph., Stram., stry., Sulph., tarax., tarent., teucr., thuj., valer., verat-v., verat., Visc., zinc.

errors in diet : Cic.

eructations amel. : Kali-c.

eruptions fail to break out, when : Ant-t., Cupr., Zinc.



exanthemata repelled or do not appear, when : Ant-t., bry., camph., cupr., gels., ip., stram., sulph., Z

উপসংহার

মৃগী রোগী যখন-তখন জ্ঞান হারাতে পারে। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য তার মানসিক বিভ্রম হতে পারে। তাই এ সময়টুকু রোগীর পাশে থেকে তাকে আশ্বস্ত করা উচিৎ। পুরোপুরি স্বাভাবিক ও সক্ষম অবস্থায় আসার আগ পর্যন্ত রোগীকে ছেড়ে যাওয়া ঠিক নয়। রোগীর আশে-পাশের লোকদের জন্য এটা নৈতিক দায়িত্ব ও মানবিক কর্তব্য।

মৃগী রোগী দূরে কোথাও গেলে তার উচিৎ সাথে পরিচয়পত্র ও পরিচিতদের ফোন নম্বর সংরক্ষণ করা। কারণ রাস্তা-ঘাটে যে কোন সময় বিপদে পড়লে তার আত্মীয়-স্বজনকে যেন জানানো যায়।

মৃগী রোগীদেরকে অনেক সাবধানে চলতে হয়। মৃগী রোগীদের কিছু কাজ কোন অবস্থাতেই করা ঠিক নয়, যেমন-গোসল করতে পুকুরে বা নদীতে নামা, আগুনের পাশে যাওয়া, গাছে বা ছাদে উঠা ইত্যাদি। একজন উপযুক্ত সাহায্যকারী সাথে থাকলেও তার সদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

খিঁচুনি আক্রান্ত অবস্থায় রোগীকে সরানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। স্বাভাবিকভাবেই খিঁচুনি শেষ হওয়ার জন্য সময় দিতে হবে। খিচুনী বন্ধ করার জন্য রোগীকে চেপে ধরা যাবে না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। রোগীর মুখে জোর করে আঙ্গুল বা অন্য কিছু ঢুকানোর চেষ্টা করা যাবে না। রোগীর জিহবায় দাত দিয়ে কামড় লাগলেও খিঁচুনিরত অবস্থায় তা ছাড়ানোর জন্য কোন রকমের জোরাজুরি করা উচিৎ নয়।

মৃগী রোগীদেরকে অনেক নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। খিঁচুনি উঠলে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন