অজ্ঞান হওয়ার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
অজ্ঞান হওয়ার কারণ ও লক্ষণভিত্তিক ঔষধ নির্বাচন নির্দেশিকা
হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে কিছু সময়ের জন্য সাড়া না দেওয়াকে সাধারণভাবে অজ্ঞান হওয়া বা Syncope/Collapse বলা হয়। অজ্ঞান হওয়ার আগে অনেকের মাথা ঝিমঝিম করা, চোখে অন্ধকার দেখা, দুর্বল লাগা, বমি বমি ভাব, ঘাম হওয়া বা বুক ধড়ফড় করার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
অজ্ঞান হওয়া নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন—অতিরিক্ত ভয় বা মানসিক আঘাত, রক্তক্ষরণ, পানিশূন্যতা, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত গরম, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, মূত্রের বাধা, খিঁচুনি, মাথায় আঘাত ইত্যাদি।
হোমিওপ্যাথিতে অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু “অজ্ঞান” লক্ষণ দেখে ঔষধ নির্বাচন না করে অজ্ঞান হওয়ার কারণ, পূর্ববর্তী লক্ষণ, রোগীর সামগ্রিক গঠন এবং অজ্ঞান অবস্থার বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা হয়।
অজ্ঞান হওয়ার বিভিন্ন কারণ ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধ
১. আঘাতের পর অজ্ঞান
আঘাত, পড়ে যাওয়া বা শরীরে আঘাত পাওয়ার পর অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে Arnica গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
Arnica
• আঘাতের পর অজ্ঞান বা Collapse
• শরীরে আঘাতের ইতিহাস
• স্পর্শ সহ্য করতে না চাওয়া
• আঘাতের পর শরীর ভেঙে যাওয়ার অনুভূতি
২. বজ্রাঘাত বা বৈদ্যুতিক শকের মতো আকস্মিক ঘটনার পর
অত্যন্ত আকস্মিক ও তীব্র শকের পর অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে পুরনো Materia Medica-তে Morphinum-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
৩. অস্ত্রোপচার বা অপারেশনের দৃশ্য দেখে অজ্ঞান
অপারেশন, রক্তপাত বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে Aconitum ও Hypericum-এর কথা বিবেচনা করা হয়।
৪. রক্তক্ষরণের পর অজ্ঞান
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুর্বলতা ও Collapse দেখা দিলে China বিশেষভাবে বিবেচ্য।
China
• রক্তক্ষরণ বা শরীরের তরল ক্ষয়ের পর দুর্বলতা
• অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের পর মাথা ঘোরা
• শরীর ভেঙে পড়ার অনুভূতি
• দুর্বলতা ও অবসন্নতা
Ipecacuanha-ও রক্তক্ষরণ-পরবর্তী কিছু ক্ষেত্রে Materia Medica-তে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে রক্তপাতের সঙ্গে বমি বমি ভাব থাকলে।
৫. অতিরিক্ত বমি বা ডায়রিয়ার পর অজ্ঞান
বারবার বমি বা পাতলা পায়খানার ফলে শরীরের তরল ও লবণ কমে গেলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে China, Arsenicum album, Camphora, Carbo vegetabilis এবং Veratrum album-এর লক্ষণগত মিল বিবেচনা করা হয়।
৬. আঘাতের পর ভয় ও ঠান্ডা হয়ে Collapse
আঘাত বা আকস্মিক শকের পর রোগী ঠান্ডা, দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে গেলে Camphora-এর কথা বিবেচনা করা হয়।
Camphora
• শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
• Collapse
• শীতলতা
• আকস্মিক দুর্বলতা
৭. মূত্র বন্ধ হওয়ার সঙ্গে অজ্ঞান বা Collapse
মূত্রত্যাগে বাধা ও তীব্র অসুস্থতার সঙ্গে Collapse দেখা দিলে Digitalis, Plumbum এবং Urea-এর মতো ঔষধের লক্ষণগত মিল বিবেচনা করা হয়।
তবে হঠাৎ প্রস্রাব সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয় হতে পারে।
৮. মৃগী বা খিঁচুনির সঙ্গে অজ্ঞান
খিঁচুনির পর বা খিঁচুনির সঙ্গে জ্ঞান হারানোর ক্ষেত্রে রোগীর সম্পূর্ণ Convulsive picture এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করতে হয়।
Materia Medica ও Repertory-তে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ঔষধের মধ্যে রয়েছে—
Cuprum, Cicuta, Sulphur, Silicea, Bufo এবং Nicotinum।
৯. ভয় পাওয়ার পর অজ্ঞান
হঠাৎ ভয়, আতঙ্ক বা আশঙ্কার পর অজ্ঞান হলে রোগীর মানসিক প্রতিক্রিয়া ও শারীরিক লক্ষণ অনুযায়ী Aconitum napellus, Argentum nitricum, Lac caninum ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়।
Aconitum
• আকস্মিক ভয়
• তীব্র উৎকণ্ঠা
• অস্থিরতা
• ভয়-পরবর্তী আকস্মিক অসুস্থতা
Argentum nitricum
• ভয় ও উদ্বেগ
• ভবিষ্যৎ ঘটনা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
• উত্তেজনায় শারীরিক দুর্বলতা
১০. রক্ত দেখলে অজ্ঞান
রক্ত দেখার পর দুর্বল হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতায় Nux moschata-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
১১. অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনার পর অজ্ঞান
মানসিক উত্তেজনা, আবেগ, অতিরিক্ত আনন্দ বা মানসিক চাপের পর অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে Coffea ও Ignatia-এর লক্ষণগত মিল বিবেচনা করা হয়।
Ignatia
• তীব্র আবেগ
• মানসিক আঘাত
• দুঃখ বা উত্তেজনার পর বিভিন্ন শারীরিক প্রতিক্রিয়া
Coffea
• অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনা
• অতিসংবেদনশীলতা
• ঘুমের ব্যাঘাত ও উত্তেজনা
১২. ঋতুস্রাবের সময় অজ্ঞান
ঋতুস্রাবের সময় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতায় Nux vomica ও Pulsatilla-এর লক্ষণগত মিল বিবেচনা করা যেতে পারে।
১৩. গর্ভাবস্থায় অজ্ঞান
গর্ভাবস্থায় মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার পেছনে রক্তস্বল্পতা, নিম্ন রক্তচাপ, পানিশূন্যতা, রক্তে শর্করার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই কারণ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুরনো হোমিওপ্যাথিক Materia Medica-তে Nux moschata ও Nux vomica-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণ বিবেচনা করে নির্বাচন করা উচিত।
১৪. প্রসবের সময় অজ্ঞান
প্রসবকালীন Collapse বা অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে Nux vomica ও Pulsatilla-এর লক্ষণগত ছবি বিবেচনা করা হয়।
তবে প্রসবের সময় অজ্ঞান হওয়া হলে দ্রুত প্রসূতি চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
১৫. মলত্যাগের সময় অজ্ঞান
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের সঙ্গে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতায় Sulphur-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৬. ধোঁয়া বা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শের পর অজ্ঞান
ধোঁয়া, গ্যাস বা শ্বাসের সঙ্গে ক্ষতিকর পদার্থ প্রবেশের পর অজ্ঞান হলে এটি জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
Materia Medica-তে Arnica ও Opium-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৭. রাগের পর অজ্ঞান
তীব্র রাগ, মানসিক উত্তেজনা বা আবেগের পর অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে Gelsemium-এর লক্ষণগত মিল বিবেচনা করা হয়।
১৮. পেটব্যথার সঙ্গে অজ্ঞান
তীব্র পেটব্যথা, দুর্বলতা ও Collapse-এর ক্ষেত্রে Nux vomica-সহ অন্যান্য ঔষধ রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়।
১৯. সামান্য নড়াচড়াতেই অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা
Digitalis-এর ক্ষেত্রে সামান্য নড়াচড়ায় অসুস্থতা বেড়ে যাওয়া, দুর্বলতা ও Collapse-এর মতো বৈশিষ্ট্য Materia Medica-তে উল্লেখযোগ্য।
২০. অতিরিক্ত গরম বা বদ্ধ পরিবেশে অজ্ঞান
অতিরিক্ত গরম, রোদ, বদ্ধ ঘর বা গরম আবহাওয়ার সঙ্গে অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে Glonoinum, Carbo vegetabilis এবং অন্যান্য ঔষধ রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়।
অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ Repertory নির্দেশনা
Kent Repertory-তে Collapse-এর অধীনে বিভিন্ন হোমিওপ্যাথিক ঔষধ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
Collapse:
Aceticum acidum, Ammonium carbonicum, Apis, Arsenicum album, Camphora, Carbo vegetabilis, Cuprum, Digitalis, Gelsemium, Glonoinum, Lachesis, Morphinum, Naja, Opium, Phosphorus, Plumbum, Secale, Stramonium, Sulphur, Tabacum, Veratrum album প্রভৃতি।
Diarrhoea, after:
Arsenicum album, Camphora, Carbo vegetabilis, Veratrum album।
Vomiting, during:
Arsenicum album প্রভৃতি।
Vomiting, after:
Arsenicum album, Lobelia, Physostigma, Veratrum album প্রভৃতি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—Repertory-তে কোনো একটি Rubric-এর অধীনে কোনো ঔষধের নাম থাকলেই সেই ঔষধ রোগীর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায় না। রোগীর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, কারণ, Modalities, Concomitants এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ মিলিয়ে ঔষধ নির্বাচন করতে হয়।
অজ্ঞান রোগীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক করণীয়
অজ্ঞান অবস্থায় রোগীকে জোর করে পানি, খাবার বা কোনো ঔষধ মুখে দেওয়া উচিত নয়। রোগীকে নিরাপদ স্থানে শুইয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না লক্ষ্য করতে হবে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
বিশেষ করে নিচের পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে/জরুরি বিভাগে নেওয়া প্রয়োজন—
• প্রথমবার হঠাৎ অজ্ঞান হলে
• দীর্ঘ সময় জ্ঞান না ফিরলে
• মাথায় আঘাতের পর অজ্ঞান হলে
• বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে
• খিঁচুনি হলে
• অতিরিক্ত রক্তপাত হলে
• গর্ভাবস্থায় অজ্ঞান হলে
• ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে
• অজ্ঞান হওয়ার পর কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হওয়া বা অন্য কোনো স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দিলে
• বারবার অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা ঘটলে
ঘ্রাণ বা মর্দন প্রসঙ্গে
অজ্ঞান রোগীকে মুখে ঔষধ খাওয়ানো নিরাপদ নয়। রোগী সচেতন না থাকলে মুখে কোনো তরল বা বড়ি দেওয়া উচিত নয়, কারণ শ্বাসনালীতে ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিবেচনা করার আগে রোগীর নিরাপত্তা এবং অজ্ঞান হওয়ার কারণ নির্ণয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচনের মূলনীতি
অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু “অজ্ঞান” লক্ষণকে কেন্দ্র করে ঔষধ নির্বাচন না করে—
১. কী কারণে অজ্ঞান হয়েছে?
২. অজ্ঞান হওয়ার আগে কী লক্ষণ ছিল?
৩. কতক্ষণ অজ্ঞান ছিল?
৪. অজ্ঞান অবস্থায় মুখমণ্ডল ও শরীরের কী পরিবর্তন হয়েছিল?
৫. রক্তক্ষরণ, বমি বা ডায়রিয়া হয়েছিল কি না?
৬. ভয়, রাগ, দুঃখ বা মানসিক আঘাতের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না?
৭. গরম, ভিড়, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা না খেয়ে থাকার সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না?
৮. অজ্ঞান হওয়ার পর রোগীর কী কী লক্ষণ দেখা দিয়েছে?
এসব তথ্য সংগ্রহ করে Repertory ও Materia Medica-এর সাহায্যে সামগ্রিক লক্ষণসমষ্টির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ঔষধ নির্বাচন করাই হোমিওপ্যাথিক কেস বিশ্লেষণের মূল পদ্ধতি।
উপসংহার
অজ্ঞান হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সংকেত। এর পেছনে সাধারণ দুর্বলতা থেকে শুরু করে হৃদ্যন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, রক্তক্ষরণ বা অন্যান্য গুরুতর কারণ থাকতে পারে। তাই প্রতিটি অজ্ঞান হওয়ার ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীর কারণ, পূর্বলক্ষণ, মানসিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য, Modalities এবং Concomitant লক্ষণ বিচার করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়। Repertory এবং Materia Medica এই বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গ্রন্থ।
হোমিওপ্যাথি পাঠশালাশিক্ষা • গবেষণা • ক্লিনিক্যাল জ্ঞান
লেখক
ডাঃ ইয়াকুব আলী সরকার
ইভা হোমিও হল
এ আর টাওয়ার রুম নাম্বার ৯
বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে
আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড
বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
মোবাইল নাম্বার 01716651488
