হোমিওপ্যাথি পাঠশালা Homeopathy Pathshala 

চোখের অঞ্জনির হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

অঞ্জনি কী?

চোখের পাতার লোমকূপ বা তেলগ্রন্থির কাছে সৃষ্ট ছোট, বেদনাযুক্ত ফোঁড়াকে অঞ্জনি বা Stye (Hordeolum) বলা হয়। এটি সাধারণত চোখের পাতার কিনারায় দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে লালচে ভাব, ফোলা, স্পর্শে ব্যথা বা টনটনে অনুভূতি থাকতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত পুঁজ জমে যায়।

অঞ্জনি সাধারণত স্বল্পমেয়াদি সমস্যা হলেও বারবার হলে এর কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক পরিচর্যা

প্রাথমিক অবস্থায় পরিষ্কার ঠান্ডা পানির সেঁক আরাম দিতে পারে। তবে অঞ্জনিতে উষ্ণ সেঁক অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর, কারণ এটি জমে থাকা নিঃসরণ নরম হতে এবং স্বাভাবিকভাবে বের হতে সহায়তা করতে পারে।

চোখে চাপ দিয়ে পুঁজ বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়। চোখ পরিষ্কার রাখা এবং ব্যক্তিগত তোয়ালে বা প্রসাধনী অন্যের সঙ্গে ব্যবহার না করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বোরিক রেপার্টরিতে অঞ্জনি

Boger Repertory-তে Styes (Hordeolum) অধ্যায়ে উল্লেখযোগ্য ঔষধগুলোর মধ্যে রয়েছে:

Agaricus, Apis, Aurum muriaticum natronatum, Calcarea picrata, Conium, Graphites, Hepar sulphuris, Lycopodium, Mercurius, Pulsatilla, Sepia, Silicea, Staphysagria, Sulphur, Thuja এবং Uranium।

তবে শুধু “অঞ্জনি” নামের ওপর ভিত্তি করে ঔষধ নির্বাচন করা হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ নয়। রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, আক্রান্ত চোখ, অঞ্জনির অবস্থান, ব্যথার ধরন, স্রাব, পুনরাবৃত্তি এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা উচিত।

অঞ্জনিতে গুরুত্বপূর্ণ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ

Pulsatilla

অঞ্জনির প্রাথমিক পর্যায়ে Pulsatilla বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে যখন রোগীর সামগ্রিক Pulsatilla-ধর্মী লক্ষণ উপস্থিত থাকে।

চোখের পাতায় ফোলা ও প্রদাহ, পরিবর্তনশীল উপসর্গ এবং কোমল প্রকৃতির রোগীর ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে বিবেচ্য।

মূল ভাব: অঞ্জনির সঙ্গে রোগীর সামগ্রিক Pulsatilla লক্ষণের মিল থাকা।

Hepar sulphuris

অঞ্জনিতে স্পর্শে অত্যন্ত সংবেদনশীলতা, কাঁটার মতো বা তীব্র ব্যথা এবং পুঁজ হওয়ার প্রবণতা থাকলে Hepar sulphuris গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ।

অঞ্জনি পাকতে শুরু করলে এবং সামান্য স্পর্শেও ব্যথা বাড়লে এর নির্বাচন আরও শক্তিশালী হতে পারে।

মূল ভাব: স্পর্শে অতিসংবেদনশীলতা, তীব্র ব্যথা ও পুঁজ হওয়ার প্রবণতা।

Mercurius solubilis

চোখের পাতায় অঞ্জনি হওয়ার পর গুটি থেকে গেলে, বিশেষ করে উপরের পাতায় শক্ত বা তুলনামূলক কম বেদনাযুক্ত গুটি থাকলে Mercurius solubilis বিবেচনা করা যেতে পারে।

মূল ভাব: প্রদাহের পর স্থায়ী গুটি বা অবশিষ্ট স্ফীতি।

Staphysagria

উপরের চোখের পাতায় অঞ্জনি, বারবার অঞ্জনি হওয়া অথবা অঞ্জনি সম্পূর্ণভাবে না পেকে শক্ত গুটির মতো থেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে Staphysagria একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ।

মূল ভাব: পুনরাবৃত্ত অঞ্জনি এবং প্রদাহের পর অবশিষ্ট গুটি।

Thuja occidentalis

বারবার অঞ্জনি হওয়ার ক্ষেত্রে রোগীর সামগ্রিক Thuja-লক্ষণ থাকলে Thuja occidentalis বিবেচনা করা হয়।

শুধু পূর্বের কোনো ঔষধ ব্যর্থ হয়েছে বলেই Thuja নির্বাচন না করে রোগীর পূর্ণ লক্ষণসমষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচন করা উচিত।

মূল ভাব: পুনরাবৃত্ত অঞ্জনি এবং Thuja-র সামগ্রিক সাংবিধানিক লক্ষণ।

Graphites

চোখের পাতায় দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, গুটি এবং আঠালো বা চটচটে স্রাবের প্রবণতা থাকলে Graphites বিবেচ্য হতে পারে।

Silicea

বারবার অঞ্জনি হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী গুটি, পুঁজ জমে থাকলেও সহজে বের না হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সমস্যা চলতে থাকলে Silicea গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য ঔষধ।

মূল ভাব: দীর্ঘস্থায়ী ও পুনরাবৃত্ত পুঁজপ্রবণ গুটি।

Conium

চোখের পাতায় শক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও তুলনামূলক কম বেদনাযুক্ত গুটি থাকলে Conium-এর কথা বিবেচনা করা হয়।

মূল ভাব: শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী গুটি।

Calcarea picrata

অঞ্জনির পুনরাবৃত্তি এবং বিশেষ ধরনের শক্ত গুটি থাকলে Calcarea picrata রেপার্টরি-ভিত্তিক নির্বাচনে আসতে পারে।

Sulphur

বারবার অঞ্জনি হওয়ার প্রবণতা এবং রোগীর সামগ্রিক Sulphur-লক্ষণ থাকলে Sulphur বিবেচনা করা যেতে পারে।

অবস্থানভেদে গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ

ডান চোখে অঞ্জনি

Anacardium, Cuprum metallicum, Ferrum phosphoricum এবং Natrum muriaticum প্রভৃতি ঔষধ রেপার্টরি-ভিত্তিক বিবেচনায় আসতে পারে।

বাম চোখে অঞ্জনি

Baryta carbonica, Colchicum, Elaps, Hydrastis, Hypericum এবং Staphysagria প্রভৃতি ঔষধ বিবেচ্য হতে পারে।

শক্ত গুটি বা কঠিনতা থাকলে

Calcarea, Conium, Sepia, Silicea, Staphysagria এবং Thuja প্রভৃতি লক্ষণসাদৃশ্য অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়।

বারবার অঞ্জনি হলে

Alumina, Carbo sulphuratum, Conium, Graphites, Psorinum, Silicea এবং Sulphur প্রভৃতি ঔষধ রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ অনুসারে বিবেচনা করা যেতে পারে।

চোখের পাতার ভেতরের দিকে অঞ্জনি

Baryta carbonica, Natrum muriaticum এবং Stannum প্রভৃতি ঔষধ রেপার্টরি-লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচ্য।

ভেতরের কোণের কাছে অঞ্জনি

Calcarea carbonica, Lachesis, Lycopodium, Natrum muriaticum, Petroleum, Pulsatilla এবং Silicea প্রভৃতি ঔষধ লক্ষণসাদৃশ্য অনুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে।

বাইরের কোণের কাছে

Aurum metallicum এবং Sulphur প্রভৃতি ঔষধ বিবেচনা করা হয়।

উপরের চোখের পাতায়

Anacardium, Belladonna, Ferrum phosphoricum, Mercurius solubilis, Pulsatilla এবং Staphysagria উল্লেখযোগ্য।

নিচের চোখের পাতায়

Colchicum, Cuprum, Elaps, Ferrum phosphoricum, Graphites, Hypericum, Kali phosphoricum, Phosphorus, Pulsatilla, Rhus toxicodendron এবং Senega প্রভৃতি ঔষধ রেপার্টরি-ভিত্তিক বিবেচনায় আসতে পারে।

অঞ্জনির ঔষধ নির্বাচনে পার্থক্য

অঞ্জনির ক্ষেত্রে একই রোগনামের জন্য সবার একই ঔষধ প্রযোজ্য নয়। নিচের পার্থক্যগুলো চিকিৎসকের ঔষধ নির্বাচনে সহায়ক হতে পারে।

Pulsatilla বনাম Hepar sulphuris

Pulsatilla অঞ্জনির প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর সামগ্রিক Pulsatilla-লক্ষণসহ বিবেচ্য। অন্যদিকে Hepar sulphuris-এ স্পর্শে তীব্র সংবেদনশীলতা, ব্যথা এবং পুঁজ হওয়ার প্রবণতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Hepar sulphuris বনাম Mercurius solubilis

Hepar sulphuris-এ সক্রিয় প্রদাহ, স্পর্শকাতরতা ও পুঁজ হওয়ার প্রবণতা প্রধান। Mercurius solubilis-এ প্রদাহের পর গুটি বা অবশিষ্ট স্ফীতির চিত্র বেশি প্রাধান্য পেতে পারে।

Mercurius solubilis বনাম Staphysagria

Mercurius solubilis-এ প্রদাহের পর স্থায়ী গুটি থাকলে বিবেচনা করা হয়। Staphysagria-তে বিশেষ করে পুনরাবৃত্ত অঞ্জনি বা না পেকে শক্ত গুটির মতো থেকে যাওয়ার চিত্র গুরুত্বপূর্ণ।

Staphysagria বনাম Thuja

দুটিই পুনরাবৃত্ত অঞ্জনিতে বিবেচ্য হতে পারে। তবে Staphysagria নির্বাচনে রোগীর নির্দিষ্ট স্থানীয় লক্ষণ ও সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য এবং Thuja নির্বাচনে Thuja-র সুস্পষ্ট সাংবিধানিক লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Conium বনাম Silicea

Conium-এ শক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও কম বেদনাযুক্ত গুটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। Silicea-তে দীর্ঘস্থায়ী, পুনরাবৃত্ত এবং পুঁজপ্রবণ গুটি বেশি প্রাসঙ্গিক।

চিকিৎসকের জন্য কেসটেকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক

অঞ্জনির ক্ষেত্রে শুধু চোখের গুটি পর্যবেক্ষণ করলেই যথেষ্ট নয়। কেস নেওয়ার সময় লক্ষ্য করা উচিত:

আক্রান্ত চোখ ডান না বাম।

উপরের না নিচের চোখের পাতা।

ভেতরের না বাইরের কোণে অবস্থান।

গুটি নরম না শক্ত।

ব্যথা আছে কি না এবং ব্যথার প্রকৃতি।

স্পর্শে ব্যথা বাড়ে কি না।

লালচে ভাব ও ফোলা কতটা।

পুঁজ তৈরি হয়েছে কি না।

স্রাবের প্রকৃতি।

কতদিন ধরে সমস্যা চলছে।

আগেও একই সমস্যা হয়েছিল কি না।

অন্য কোনো চোখের রোগ বা ত্বকের সমস্যা আছে কি না।

রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য।

এসব তথ্যের সমন্বয়ে রেপার্টরি বিশ্লেষণ করে ঔষধ নির্বাচন করা অধিক যুক্তিসংগত।

কখন বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন

অঞ্জনির সঙ্গে চোখের চারপাশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ফোলা বা লালচে ভাব, দৃষ্টির পরিবর্তন, চোখ নড়াচড়ায় ব্যথা, তীব্র ব্যথা, জ্বর, অথবা চোখের চারপাশে গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

অঞ্জনি বারবার হলে ডায়াবেটিসসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা এবং চোখের পাতার দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মতো কারণগুলোও চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

নিজে নিজে চোখে কোনো ওষুধ, পুঁজ বের করার যন্ত্র বা অপরিষ্কার বস্তু ব্যবহার করবেন না। হোমিওপ্যাথিক ঔষধও রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টি ও যথাযথ কেসটেকিংয়ের ভিত্তিতে দক্ষ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত।

উপসংহার

অঞ্জনি সাধারণত চোখের পাতার একটি স্থানীয় প্রদাহজনিত সমস্যা। তবে বারবার হওয়া, দীর্ঘদিন গুটি থেকে যাওয়া, অতিরিক্ত ব্যথা বা পুঁজের প্রবণতার ক্ষেত্রে শুধু রোগের নাম নয়, রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা প্রয়োজন।

রেপার্টরি, মেটেরিয়া মেডিকা এবং রোগীর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বিত বিশ্লেষণই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ঔষধ নির্বাচনের ভিত্তি।

লেখক পরিচিতি

ডা. ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, এ আর টাওয়ার রুম নাম্বার ৯, আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে, বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫১৪৮৮