Homeopathic treatment for Water brash



মুখ দিয়ে জল ওঠা বা Water Brash-এর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

মুখ দিয়ে হঠাৎ টক, কটু বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে এমন তরল উঠে আসা এবং একই সঙ্গে অতিরিক্ত লালা পড়াকে সাধারণভাবে Water Brash বা মুখ দিয়ে জল ওঠা বলা হয়। অনেক সময় এর সঙ্গে বুকজ্বালা, টক ঢেকুর, বমি বমি ভাব এবং অম্লতার অনুভূতি থাকতে পারে।

এটি নিজে আলাদা কোনো রোগ না হয়ে বদহজম, অম্লতা বা Acid Dyspepsia এবং পাকস্থলী ও খাদ্যনালীর বিভিন্ন সমস্যার একটি লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

মুখ দিয়ে জল ওঠা কী?

খাবার হজমের সময় পাকস্থলীর অম্লীয় উপাদান কখনও কখনও খাদ্যনালীর দিকে উঠে আসে। এর সঙ্গে মুখে হঠাৎ প্রচুর লালা জমতে পারে। উঠে আসা তরলটি টক, কটু বা জ্বালাকর হলে রোগীর মুখে পানির মতো তরল চলে আসে এবং বুক ও গলায় জ্বালাপোড়া অনুভূত হতে পারে। এই অবস্থাকেই Water Brash বলা হয়।

সাধারণ লক্ষণ

মুখ দিয়ে জল ওঠার সময় বিভিন্ন রোগীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যেতে পারে। যেমন—

• মুখে হঠাৎ অতিরিক্ত লালা জমা হওয়া
• টক বা অম্লীয় তরল মুখে উঠে আসা
• বুকজ্বালা বা অম্বল
• টক ঢেকুর
• গলা বা খাদ্যনালিতে জ্বালাপোড়া
• বমি বমি ভাব
• খাবারের পর পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা
• মুখে টক, কটু বা ধাতব স্বাদ
• কখনও মুখের লালা আঠালো, ঘন বা ফেনাযুক্ত হওয়া
• শোয়ার পর বা রাতে সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়া

কেন হয়?

মুখ দিয়ে জল ওঠার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন—

• বদহজম বা অজীর্ণ
• অতিরিক্ত অম্লতা
• Acid Dyspepsia
• পাকস্থলী থেকে অম্লীয় উপাদান খাদ্যনালিতে উঠে আসা
• অতিরিক্ত বা অনিয়মিত খাবার গ্রহণ
• অতিরিক্ত ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার
• দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস
• কিছু ক্ষেত্রে পাকস্থলী ও খাদ্যনালীর অন্যান্য সমস্যা

তাই শুধু মুখ দিয়ে জল ওঠার লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় না করে রোগীর সম্পূর্ণ কেস গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

হোমিওপ্যাথিতে ঔষধ নির্বাচনের মূলনীতি

হোমিওপ্যাথিতে Water Brash-এর জন্য শুধু রোগের নামের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন করা হয় না। রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, কখন সমস্যা হয়, খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক, বুকজ্বালার ধরন, মুখের লালার বৈশিষ্ট্য, মানসিক ও শারীরিক গঠন এবং অন্যান্য সহগামী লক্ষণ বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।

অর্থাৎ একই ধরনের মুখ দিয়ে জল ওঠার সমস্যায় দুইজন রোগীর জন্য একই ঔষধ প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

Water Brash-এ উল্লেখযোগ্য কিছু হোমিওপ্যাথিক ঔষধ

Lycopodium

খাবারের পর বদহজম, গ্যাস, পেট ফাঁপা এবং অম্লতার সঙ্গে মুখ দিয়ে টক তরল ওঠার ক্ষেত্রে Lycopodium-এর কথা বিবেচনা করা হয়। অল্প খাবারেই পেট ভরা মনে হওয়া এবং হজমের গোলমাল থাকলে এর লক্ষণগত মিল খুঁজে দেখা যায়।

Nux Vomica

অতিরিক্ত খাবার, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, মসলা বা উত্তেজক খাদ্যের পর বদহজম, অম্লতা, টক ঢেকুর এবং বুকজ্বালার সঙ্গে Water Brash থাকলে Nux Vomica-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

Pulsatilla

খাবারের পরে বদহজম, মুখে টক বা অস্বস্তিকর তরল ওঠা এবং বিশেষ করে তেল-চর্বিযুক্ত খাবারে সমস্যা বাড়লে Pulsatilla-এর লক্ষণ দেখা হয়। মুখে লালা বা জলীয় অনুভূতির সঙ্গে হজমের দুর্বলতা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।

Robinia

তীব্র অম্লতা, টক ঢেকুর, বুকজ্বালা এবং পাকস্থলীর অম্লীয় উপাদান উপরে উঠে আসার প্রবণতা থাকলে Robinia-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

Carbo vegetabilis

বদহজম, পেট ফাঁপা, ঢেকুর এবং খাবারের পর অস্বস্তির সঙ্গে মুখে অম্লীয় তরল ওঠার ক্ষেত্রে Carbo vegetabilis-এর লক্ষণ মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

Natrum carbonicum

হজমের দুর্বলতা এবং নির্দিষ্ট খাবারের পর অম্লতা ও মুখে জল ওঠার প্রবণতা থাকলে Natrum carbonicum-এর ব্যক্তিগত লক্ষণগুলো বিবেচনা করা হয়।

Capsicum

বুকজ্বালা, অম্লতা এবং মুখে জল ওঠার সঙ্গে মুখ বা গলা জ্বালাপোড়ার বিশেষ অনুভূতি থাকলে Capsicum-এর লক্ষণ পরীক্ষা করা যেতে পারে।

Bryonia

খাবারের পর হজমের গোলমাল, পেটে অস্বস্তি এবং খাদ্যনালীতে ব্যথা বা জ্বালাপোড়ার সঙ্গে Water Brash থাকলে Bryonia-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

Veratrum album

খাবারের পরে পেটে ব্যথা, দুর্বলতা এবং হাত-পা ঠান্ডা থাকার মতো বৈশিষ্ট্যসহ হজমের গোলমাল থাকলে Veratrum album-এর লক্ষণ মিলিয়ে দেখা হয়।

Antimonium crudum

অজীর্ণতা, খাবারের প্রতি অস্বস্তি, জিহ্বায় সাদা আবরণ এবং পাকস্থলীর গোলমালের সঙ্গে মুখে টক বা অস্বস্তিকর তরল ওঠার ক্ষেত্রে Antimonium crudum-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

Calcarea carbonica

হজমের দুর্বলতা, অম্লতা, খাবারের পর অস্বস্তি এবং সামগ্রিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল থাকলে Calcarea carbonica-এর লক্ষণ দেখা হয়।

Carbo acid

মুখে অস্বাভাবিক লালা, অম্লতা এবং পাকস্থলীর গোলমালের বিশেষ লক্ষণ থাকলে Carbo acid-এর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

Abies nigra

খাবারের পর পাকস্থলীতে ভারী বা চাপের অনুভূতি, বদহজম ও অস্বস্তির সঙ্গে মুখ দিয়ে তরল ওঠার ক্ষেত্রে Abies nigra-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

Acetic acid

মুখে অতিরিক্ত লালা, অম্লীয় অনুভূতি এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ থাকলে Acetic acid-এর লক্ষণ মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

Kent Repertory অনুযায়ী লালাস্রাবের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য

Water Brash-এর ক্ষেত্রে শুধু “লালা বেশি” এই সাধারণ লক্ষণ যথেষ্ট নয়। লালার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যও ঔষধ নির্বাচনে সহায়ক হতে পারে।

টক লালা — Sour saliva

টক বা অম্লীয় লালার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঔষধের মধ্যে Agaricus, Alumina, Calcarea, Ignatia, Kali bichromicum, Lycopodium, Mercurius, Natrum muriaticum, Phosphorus, Pulsatilla, Sulphur প্রভৃতি লক্ষণভেদে বিবেচনা করা হয়।

আঠালো বা সুতো টানার মতো লালা — Viscid saliva

লালা যদি আঠালো, ঘন বা সুতো টানার মতো হয়, তাহলে Acetic acid, Belladonna, Bryonia, Calcarea, Carbo vegetabilis, Chelidonium, Kali bichromicum, Lachesis, Lycopus, Mercurius, Phosphorus, Pulsatilla, Veratrum প্রভৃতি ঔষধের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ মিলিয়ে দেখা যায়।

ফেনাযুক্ত লালা — Frothy saliva

মুখে ফেনার মতো লালা হলে Aconitum, Apis, Berberis, Bryonia, Bufo, Cantharis, Carbo vegetabilis, Chamomilla, Cina, Cuprum, Digitalis, Hyoscyamus, Ignatia, Kali bichromicum, Mercurius, Pulsatilla, Sulphur ইত্যাদি ঔষধের লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

জলীয় বা পাতলা লালা — Watery saliva

লালা যদি একেবারে পানির মতো পাতলা হয়, তাহলে Asarum, Calcarea, Camphora, Carbo vegetabilis, Cyclamen, Jatropha, Kreosotum, Lycopodium, Natrum muriaticum, Phosphorus, Pulsatilla, Sulphuric acid ইত্যাদি লক্ষণভেদে বিবেচনা করা যেতে পারে।

দুর্গন্ধযুক্ত লালা — Fetid saliva

মুখের লালায় দুর্গন্ধ থাকলে Arsenicum album, Digitalis, Iodium, Mercurius, Nitric acid, Petroleum প্রভৃতি ঔষধের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ পরীক্ষা করা হয়।

কটু বা জ্বালাকর লালা — Acrid saliva

লালা যদি কটু, ঝাঁঝালো বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে, তাহলে Agaricus, Arsenicum, Ignatia, Mercurius, Nitric acid, Veratrum album প্রভৃতি ঔষধের লক্ষণ বিবেচনা করা যেতে পারে।

ধাতব স্বাদের লালা — Metallic taste

মুখে ধাতব স্বাদের সঙ্গে লালা বেশি হলে Actea racemosa, Bismuthum, Chamomilla, Kali bichromicum, Kali chloricum, Lycopodium, Mercurius, Phytolacca, Ranunculus এবং Thuja-এর লক্ষণ মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

রাতে লালা বেশি হওয়া

রাতে লালা বৃদ্ধি পেলে Mercurius বা Sulphur-এর মতো ঔষধের নির্দিষ্ট লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

সকালে লালা বেশি হওয়া

সকালে অতিরিক্ত লালাস্রাব থাকলে কিছু ক্ষেত্রে Apis, Glonoinum, Petroleum, Rhus toxicodendron বা Sulphur-এর লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

মুখ দিয়ে জল ওঠার ক্ষেত্রে কেস নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

একজন রোগীর Water Brash-এর সঠিক ঔষধ নির্বাচন করতে নিচের বিষয়গুলো বিশেষভাবে জানা দরকার—

১. কখন মুখ দিয়ে জল ওঠে—খাবারের আগে না পরে?

২. কোন খাবারের পর সমস্যা বেশি হয়?

৩. তরলটি টক, কটু, তেতো নাকি অন্য কোনো স্বাদের?

৪. বুকজ্বালা কোথায় এবং কেমন অনুভূত হয়?

৫. গলা বা খাদ্যনালিতে জ্বালাপোড়া আছে কি না?

৬. লালা পাতলা, ঘন, আঠালো নাকি ফেনাযুক্ত?

৭. লালায় কোনো দুর্গন্ধ বা ধাতব স্বাদ আছে কি না?

৮. রাতে বা শোয়ার পর সমস্যা বাড়ে কি না?

৯. ঢেকুর, বমি বমি ভাব বা পেট ফাঁপার সঙ্গে সমস্যা আছে কি না?

১০. রোগীর অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য কী?

এই তথ্যগুলো মিলিয়ে Repertory এবং Materia Medica-এর সাহায্যে ব্যক্তিগতভাবে উপযুক্ত ঔষধ নির্বাচন করা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

কখন বিশেষভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

মুখ দিয়ে জল ওঠা বারবার হলে শুধু অম্লতা মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে বুকের তীব্র ব্যথা, গিলতে কষ্ট, বারবার বমি, রক্তবমি, কালো পায়খানা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা বা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

উপসংহার

মুখ দিয়ে জল ওঠা বা Water Brash সাধারণত অম্লতা, বদহজম এবং পাকস্থলী ও খাদ্যনালীর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। হোমিওপ্যাথিতে এর জন্য একাধিক ঔষধের লক্ষণ পাওয়া যায়; তবে শুধু “মুখ দিয়ে জল ওঠে” এই একটি লক্ষণের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন না করে রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা উচিত।

Lycopodium, Nux vomica, Pulsatilla, Robinia, Carbo vegetabilis, Bryonia, Capsicum, Veratrum album, Antimonium crudum, Calcarea carbonica, Natrum carbonicum, Abies nigra, Acetic acidসহ অন্যান্য ঔষধ রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে।

Repertory-তে Saliva-এর sour, acrid, frothy, watery, viscid, fetid, metallic ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যও ঔষধ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে।

নিজে নিজে ঔষধ নির্বাচন করে দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করে একজন দক্ষ ও নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
হোমিওপ্যাথি পাঠশালা
শিক্ষা, গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল জ্ঞানভিত্তিক হোমিওপ্যাথিক তথ্যভাণ্ডার

লেখক 
ডাঃ মোঃ ইয়াকুব আলী সরকার 
সভাপতি- বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম 
ইভা হোমিও হল
এ আর টাওয়ার রুম নাম্বার ৯
আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, 
বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে 
বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা
Govt. Reg. No. 23876
মোবাইল: 01716651488