হোমিওপ্যাথি পাঠশালা Homeopathy Pathshala


অনিদ্রার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

অনিদ্রা কী?

অনিদ্রা বা Insomnia হলো এমন একটি ঘুমের সমস্যা, যেখানে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘুম আসতে দেরি হয়, বারবার ঘুম ভেঙে যায়, খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় অথবা ঘুমানোর পরও পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়া যায় না।

দীর্ঘদিনের অনিদ্রা কর্মক্ষমতা, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, মেজাজ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অনিদ্রার কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

অনিদ্রার সম্ভাব্য কারণ

অনিদ্রার পেছনে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক কারণ থাকতে পারে। যেমন:

অতিরিক্ত চা বা কফি পান

অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস

রাতে অতিরিক্ত খাবার বা দেরিতে রাতের খাবার গ্রহণ

কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অস্বস্তি

অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম

দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ বা শোক

অতিরিক্ত উত্তেজনা

অস্বস্তিকর বিছানা বা ঘুমের পরিবেশ

রাতে মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্যান্য পর্দার অতিরিক্ত ব্যবহার

শারীরিক ব্যথা বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগ

কিছু ঔষধ, নিকোটিন, অ্যালকোহল বা অন্যান্য উদ্দীপক পদার্থের ব্যবহার

নারীদের মেনোপজসহ বিভিন্ন হরমোনগত পরিবর্তন

তাই শুধু অনিদ্রার লক্ষণ নয়, এর অন্তর্নিহিত কারণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অনিদ্রায় হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন নির্দেশিকা

হোমিওপ্যাথিতে ঔষধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, মানসিক অবস্থা, ঘুমের ধরন, কারণ, সময়, সহগামী লক্ষণ ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা হয়।

ইগ্নেশিয়া (Ignatia)

প্রেমবিরহ, শোক, মানসিক আঘাত বা দুঃখ মনে চেপে রাখার পর অনিদ্রা দেখা দিলে ইগ্নেশিয়া বিবেচনাযোগ্য। রোগী নির্জনতা পছন্দ করতে পারেন এবং মেজাজে পরিবর্তনশীলতা থাকতে পারে।

ক্যালকেরিয়া কার্ব (Calcarea carbonica)

মোটা, থলথলে গঠন, শীতকাতরতা, ঘুমের মধ্যে ঘাম এবং ঠান্ডার প্রতি অতিসংবেদনশীলতার সঙ্গে অনিদ্রা থাকলে এই ঔষধের লক্ষণ বিবেচনা করা হয়। ডিমের প্রতি বিশেষ আকর্ষণও একটি পরিচিত সহায়ক লক্ষণ।

হাইয়োসিয়ামাস (Hyoscyamus)

অতিরিক্ত উত্তেজনা, খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা, অস্বাভাবিক আচরণ এবং রাতভর জেগে থাকার প্রবণতা থাকলে হাইয়োসিয়ামাসের লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

কেমোমিলা (Chamomilla)

অত্যন্ত খিটখিটে ও বদমেজাজি রোগী, সামান্য কারণে রাগ, অস্থিরতা এবং শিশুদের ক্ষেত্রে কোলে না নিলে কান্না ও বিরক্তি দেখা দিলে কেমোমিলার লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

চায়না (China officinalis)

রক্ত বা শরীরের তরল পদার্থের অতিরিক্ত ক্ষয়, শারীরিক দুর্বলতা এবং তার পরবর্তী ঘুমের ব্যাঘাতের ক্ষেত্রে চায়নার লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

প্যাসিফ্লোরা (Passiflora)

অস্থিরতা বা ঘুমের সমস্যা থাকলে প্যাসিফ্লোরা হোমিওপ্যাথিতে বহুল ব্যবহৃত একটি ঔষধ। তবে ঔষধের শক্তি, মাত্রা ও ব্যবহারের পদ্ধতি রোগীর বয়স, অবস্থা ও অন্যান্য ঔষধের ওপর নির্ভর করে; তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।

এভেনা স্যাটাইভা (Avena sativa)

অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম, স্নায়বিক ক্লান্তি ও অতিরিক্ত পরিশ্রমের পর ঘুমের ব্যাঘাতের ক্ষেত্রে এভেনা স্যাটাইভার লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

রাউলফিয়া (Rauwolfia)

মানসিক উত্তেজনা, মাথাব্যথা বা উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা থাকলে রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণ বিবেচনা করে এই ঔষধের কথা ভাবা হয়। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে মূল্যায়ন জরুরি।

ককুলাস ইন্ডিকা (Cocculus indicus)

দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত জাগরণ বা শারীরিক-মানসিক ক্লান্তির পর অনিদ্রা দেখা দিলে ককুলাস ইন্ডিকার লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

কফিয়া ক্রুডা (Coffea cruda)

অতিরিক্ত মানসিক সক্রিয়তা, চিন্তা, উত্তেজনা, আনন্দ বা কোনো হঠাৎ মানসিক উদ্দীপনার পর ঘুম না এলে কফিয়া ক্রুডার লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

এছাড়াও রোগীর নির্দিষ্ট লক্ষণ অনুযায়ী আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম, আর্নিকা, আর্সেনিকাম অ্যালবাম, নাক্স ভমিকা, বেলেডোনা, সাইপ্রিপেডিয়াম, সাইক্লামেন, ড্যাফনি ইন্ডিকা প্রভৃতি ঔষধের লক্ষণ বিবেচনা করা যেতে পারে।

বোরিক রেপার্টরিতে অনিদ্রার ঔষধ নির্বাচন

Boger Boenninghausen's Characteristics and Repertory-তে Insomnia (Sleeplessness)-এর অধীনে বিভিন্ন ঔষধ পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

Absinthium, Aconitum, Agaricus, Alfalfa, Alumina, Ambra, Anacardium, Antimonium crudum, Apis, Apomorphinum, Arnica, Argentum nitricum, Arsenicum album, Aurum, Avena sativa, Baptisia, Belladonna, Cactus, Caffeine, Calcarea carbonica, Camphora, Cannabis indica, Chamomilla, China, Cimicifuga, Cocculus, Coffea, Colocynthis, Cypripedium, Daphne, Gelsemium, Hyoscyamus, Ignatia, Kali bromatum, Kali phosphoricum, Lupulus, Lyssinum, Magnesia phosphorica, Mercurius, Nux vomica, Opium, Passiflora, Phosphorus, Pulsatilla, Scutellaria, Sulphur, Sumbul, Stramonium, Thea, Valeriana, Zincum প্রভৃতি।

তবে কেবল রেপার্টরিতে কোনো ঔষধের নাম থাকা মানেই সেই ঔষধ রোগীর জন্য উপযুক্ত নয়। রোগীর পূর্ণাঙ্গ লক্ষণ সংগ্রহ করে সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন করা প্রয়োজন।

অনিদ্রার কারণভিত্তিক কিছু রেপার্টরি নির্দেশনা

পেটের গোলযোগের কারণে

Antimonium tartaricum, Cuprum metallicum প্রভৃতি লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

পায়ের অস্থিরতা, স্থির রাখতে না পারা

Medorrhinum-এর লক্ষণ বিবেচনা করা যেতে পারে।

অতিরিক্ত পেশিগত ক্লান্তির পর

Helonias-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

অ্যালকোহল বা অন্যান্য উদ্দীপক পদার্থের অভ্যাসের সঙ্গে

Arsenicum album, Avena sativa, Cannabis indica, Cimicifuga, Gelsemium, Hyoscyamus, Nux vomica, Opium, Sumbul প্রভৃতি ঔষধের লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

উদ্বেগে বিছানা থেকে উঠে পড়তে হয়, বিশেষত মধ্যরাতের পর

Arsenicum album-এর লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

দেরিতে রাতের খাবার বা অতিভোজনের পর

Pulsatilla-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

বিছানা শক্ত মনে হওয়া, শুতে অসুবিধা

Arnica, Bryonia প্রভৃতি ঔষধের লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

বিছানা অতিরিক্ত গরম মনে হওয়া

Opium-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

অতিরিক্ত কফি পানের পর

Chamomilla ও Nux vomica-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

ধূমপান বা দীর্ঘদিন নিকোটিন ব্যবহারের সঙ্গে

Plantago-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

দাঁত ওঠার সময় শিশুদের ঘুমের ব্যাঘাত

Belladonna, Borax, Chamomilla, Coffea, Cypripedium প্রভৃতি ঔষধের লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

মেনোপজের সময় জরায়ু-সংক্রান্ত অস্বস্তির সঙ্গে

Senecio-এর লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।

অনিদ্রায় স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস

অনিদ্রা কমাতে শুধু ঔষধের ওপর নির্ভর না করে ঘুমের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও জাগার অভ্যাস করুন।

বিকেল ও সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি পান এড়িয়ে চলুন।

রাতে অতিরিক্ত ভারী খাবার ও খুব দেরিতে খাবার গ্রহণ পরিহার করুন।

ঘুমের আগে মোবাইল, কম্পিউটার ও অন্যান্য উজ্জ্বল পর্দার ব্যবহার কমিয়ে দিন।

শোবার ঘর শান্ত, আরামদায়ক ও উপযুক্ত তাপমাত্রায় রাখুন।

দিনের বেলায় নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করুন।

দিনের দীর্ঘ সময় ঘুমানো এড়িয়ে চলুন।

ঘুম না এলে বিছানায় অস্থিরভাবে পড়ে না থেকে কিছুক্ষণ শান্ত ও আরামদায়ক কাজ করে পরে ঘুমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শিথিলায়ন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা ধ্যান সহায়ক হতে পারে।

বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজনীয়তা

শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ঘুমের প্রয়োজন বয়সভেদে ভিন্ন হয়।

০ থেকে ৩ মাস: ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা

৪ থেকে ১১ মাস: ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা

১ থেকে ২ বছর: ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা

৩ থেকে ৫ বছর: ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা

৬ থেকে ১৩ বছর: ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা

১৪ থেকে ১৭ বছর: ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা

১৮ থেকে ৬৪ বছর: ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা

৬৫ বছর বা তার বেশি: ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা

এগুলো সাধারণ নির্দেশনা। ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?

অনিদ্রা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে বা দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, কর্মক্ষমতা ও মনোযোগে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এ ছাড়া নাক ডাকা ও ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, অতিরিক্ত দিনের ঘুমভাব, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, বিষণ্ণতা বা তীব্র উদ্বেগ, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন কিংবা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ থাকলে অনিদ্রার অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছায় কোনো ঔষধ গ্রহণ না করে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

উপসংহার

ঘুম মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনিদ্রার চিকিৎসায় শুধু ঘুমের সমস্যা নয়, বরং এর কারণ, রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, মানসিক অবস্থা, জীবনযাপন ও সহগামী উপসর্গ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

হোমিওপ্যাথিতে রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ ও সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন করা হয়। তাই রেপার্টরিতে অনিদ্রার জন্য তালিকাভুক্ত কোনো ঔষধ নিজে থেকে নির্বাচন না করে যোগ্য ও নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুস্থ ঘুম, সুস্থ জীবন।

ডাঃ ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫১৪৮৮

x