পাইলস বা অর্শের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
হোমিওপ্যাথি পাঠশালা
পাইলস বা অর্শ মলদ্বার ও নিম্ন মলাশয়ের আশপাশের রক্তনালীর কুশন বা শিরাগুলো ফুলে যাওয়া ও স্ফীত হওয়ার একটি সাধারণ সমস্যা। এটি অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক অথবা উভয় ধরনের হতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা, কম আঁশযুক্ত খাবার, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, গর্ভাবস্থা এবং বয়স বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলেই সেটিকে শুধু পাইলস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অ্যানাল ফিশার, অন্ত্রের প্রদাহ, পলিপ বা কোলন-মলাশয়ের অন্যান্য রোগেও রক্তপাত হতে পারে। তাই নতুন বা বারবার রক্তপাত হলে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
পাইলসের প্রধান কারণ ও ঝুঁকির কারণ
১. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য
২. দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া
৩. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া
৪. খাদ্যে আঁশের পরিমাণ কম থাকা
৫. পর্যাপ্ত পানি ও তরল না খাওয়া
৬. দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা
৭. গর্ভাবস্থা
৮. অতিরিক্ত ওজন
৯. দীর্ঘ সময় বসে থাকা
১০. নিয়মিত ভারী জিনিস তোলা
১১. বয়স বৃদ্ধি
১২. পরিবারের মধ্যে পাইলসের প্রবণতা থাকা
১৩. অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ল্যাক্সেটিভ ব্যবহারের অভ্যাস
১৪. কিছু ক্ষেত্রে লিভারের গুরুতর রোগ বা পেটের ভেতরের চাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।
পাইলসের লক্ষণ
অভ্যন্তরীণ পাইলস
অভ্যন্তরীণ পাইলসের সাধারণ লক্ষণ হলো—
- মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত
- মলদ্বার দিয়ে অর্শের বলি বের হয়ে আসা
- প্রথমদিকে বের হয়ে নিজে নিজে ভেতরে চলে যাওয়া
- পরে হাত দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে হতে পারে
- উন্নত অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে এসে আর সহজে ভেতরে না ঢোকা
- মলদ্বারে চুলকানি, জ্বালা বা অস্বস্তি
- মিউকাস বা আঠালো রস বের হওয়া
অভ্যন্তরীণ পাইলস সাধারণত খুব বেশি ব্যথাযুক্ত নয়; তবে বাইরে বেরিয়ে এলে বা অন্য জটিলতা হলে ব্যথা ও অস্বস্তি হতে পারে।
বাহ্যিক পাইলস
- মলদ্বারের বাইরে ছোট বা বড় ফোলা
- স্পর্শ করলে ব্যথা বা কোমলতা
- চুলকানি ও জ্বালা
- কখনও রক্তপাত
- রক্ত জমাট বাঁধলে হঠাৎ তীব্র ব্যথাযুক্ত গুটি হতে পারে।
পাইলসের ধরন
অবস্থান অনুযায়ী প্রধানত—
১. অভ্যন্তরীণ পাইলস
২. বাহ্যিক পাইলস
৩. মিশ্র পাইলস
অর্শের বলির আকার ও চেহারা রোগীভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন—ছোলার মতো, আঙুরের থোকার মতো, ডুমুরের মতো বা অন্য ধরনের ফুলে থাকা গুটি।
অভ্যন্তরীণ পাইলসের মাত্রা
ক্লিনিক্যালভাবে অভ্যন্তরীণ পাইলসকে চারটি মাত্রায় ভাগ করা হয়—
প্রথম মাত্রা: অর্শ ভেতরে থাকে, বাইরে বের হয় না।
দ্বিতীয় মাত্রা: মলত্যাগের সময় বাইরে আসে, পরে নিজে নিজে ভেতরে চলে যায়।
তৃতীয় মাত্রা: বাইরে আসার পর হাত দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে হয়।
চতুর্থ মাত্রা: সব সময় বাইরে থাকে এবং সহজে ভেতরে ঢোকানো যায় না।
রোগের মাত্রা ও জটিলতা নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনে শারীরিক পরীক্ষা ও মলদ্বার পরীক্ষা করা হয়।
পাইলসের ক্ষেত্রে রোগী মূল্যায়ন
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় শুধু “পাইলস আছে” এই তথ্যের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন না করে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, মলত্যাগের ধরন, রক্তপাত, ব্যথার প্রকৃতি, অর্শের অবস্থা, পেটের সমস্যা, মানসিক বৈশিষ্ট্য এবং উপশম-বৃদ্ধির কারণ বিবেচনা করা হয়।
কেস নেওয়ার সময় জানতে হবে—
- কোষ্ঠকাঠিন্য আছে কি না
- মল শক্ত না নরম
- মলত্যাগে কতটা চাপ দিতে হয়
- মলত্যাগের আগে, সময় বা পরে ব্যথা হয় কি না
- রক্তের রং উজ্জ্বল না গাঢ়
- রক্ত মলের সঙ্গে মেশে নাকি শেষে পড়ে
- অর্শ বাইরে আসে কি না
- বাইরে এলে নিজে ঢোকে নাকি হাত দিয়ে ঢোকাতে হয়
- জ্বালা, চুলকানি বা খোঁচা দেওয়ার মতো ব্যথা আছে কি না
- মিউকাস বা অন্য কোনো রস বের হয় কি না
- ঠান্ডা বা গরমে কী পরিবর্তন হয়
- কোমর বা পিঠে ব্যথা আছে কি না
- খাবার ও পানীয়ের সঙ্গে লক্ষণের সম্পর্ক
- দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য আছে কি না।
পাইলসের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ
নিচের ঔষধগুলো ঐতিহ্যগত হোমিওপ্যাথিক Materia Medica ও repertory-তে পাইলসের বিভিন্ন লক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো “একটি রোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট ওষুধ”—এইভাবে না দেখে রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচন করা উচিত।
১. Aesculus hippocastanum — এসকিউলাস হিপ
কোমর ব্যথার সঙ্গে পাইলস—এর অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য। মলদ্বারে শুষ্কতা, চাপ, টান, খোঁচা বা টাটানি অনুভূতি। রক্তপাত খুব বেশি নাও থাকতে পারে। মলদ্বার শুকনো ও অস্বস্তিকর মনে হয়।
নির্বাচন লক্ষণ: পাইলস + কোমর ব্যথা + মলদ্বারে শুষ্কতা ও টাটানি।
রেপার্টরি: Hemorrhoids; burning, itching; backache, with hemorrhoids.
২. Collinsonia canadensis — কলিনসোনিয়া
কঠিন, শুকনো মল; মলত্যাগের সময় মলদ্বারে কাঁটার মতো বা ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করার মতো ব্যথা। রক্তপাত থাকতে পারে।
নির্বাচন লক্ষণ: কোষ্ঠকাঠিন্য + শক্ত মল + মলত্যাগে তীব্র ব্যথা + পাইলস।
৩. Hamamelis virginiana — হ্যামামেলিস
রক্তপাতযুক্ত পাইলসের একটি বহুল আলোচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ। শিরাজাতীয় রক্তপাত, দুর্বলতা ও ক্ষতস্থানের মতো অনুভূতি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
নির্বাচন লক্ষণ: পাইলস + সহজে রক্তপাত + শিরাজাতীয় রক্তের প্রবণতা।
৪. Aloe socotrina — এলো
অর্শের বলি মলত্যাগের সময় বের হয়ে আসে। আঙুরের থোকার মতো গঠন, মলদ্বারে জ্বালা ও চুলকানি। মলত্যাগের তাড়াহুড়া এবং মল নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার সঙ্গে পাইলসের চিত্র থাকতে পারে।
নির্বাচন লক্ষণ: আঙুরের মতো অর্শ + বেরিয়ে আসা + জ্বালা ও চুলকানি।
৫. Nux vomica — নাক্স ভমিকা
কোষ্ঠকাঠিন্য, বারবার মলত্যাগের বেগ কিন্তু অল্প মল বের হওয়া, মলত্যাগে অতিরিক্ত চাপ এবং অনিয়মিত জীবনযাপনের সঙ্গে পাইলস।
নির্বাচন লক্ষণ: বারবার মলত্যাগের বেগ + অসম্পূর্ণ মলত্যাগ + চাপ দিতে হয়।
৬. Sulphur — সালফার
মলদ্বারে জ্বালা, চুলকানি ও গরম অনুভূতি। পাইলসের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ত্বকের চুলকানি থাকতে পারে।
নির্বাচন লক্ষণ: মলদ্বারে জ্বালা + চুলকানি + গরমে অস্বস্তি।
৭. Nitricum acidum — নাইট্রিক অ্যাসিড
মলদ্বারে কাঁটা বা পিন দিয়ে বিদ্ধ করার মতো ব্যথা। মলত্যাগের সময় ও পরে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
নির্বাচন লক্ষণ: পাইলস + পিন/কাঁটার মতো ব্যথা।
৮. Muriaticum acidum — মিউরিয়াটিক অ্যাসিড
অত্যন্ত সংবেদনশীল, স্পর্শ বা কাপড়ের ঘর্ষণও সহ্য করতে না পারা মলদ্বার। পাইলস অত্যন্ত ব্যথাযুক্ত হতে পারে।
নির্বাচন লক্ষণ: অতিসংবেদনশীল পাইলস + স্পর্শে ব্যথা।
৯. Arsenicum album — আর্সেনিকাম অ্যালবাম
মলদ্বারে জ্বালা ও ব্যথার সঙ্গে অস্থিরতা, দুর্বলতা এবং শীতকাতরতা। গরমে আরামের প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
নির্বাচন লক্ষণ: জ্বালাপোড়া + অস্থিরতা + শীতকাতরতা + গরমে আরাম।
১০. Acidum sulphuricum — অ্যাসিড সালফিউরিকাম
মলদ্বারে জ্বালা ও স্রাবের সঙ্গে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে কাজ করার প্রবণতা—ঐতিহ্যগত Materia Medica-তে এই সমন্বয়টি গুরুত্ব পায়।
নির্বাচন লক্ষণ: জ্বালা + স্রাব + তাড়াহুড়োর প্রবণতা।
১১. Medorrhinum — মেডোরিনাম
মলদ্বার থেকে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, আর্দ্রতা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্শের কিছু চিত্রে বিবেচিত হয়।
নির্বাচন লক্ষণ: পাইলস + দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব + মলদ্বারে আর্দ্রতা।
১২. Antimonium crudum — অ্যান্টিমোনিয়াম ক্রুডাম
শক্ত ও গাঁটের মতো মল, মলত্যাগের সময় অর্শ বেরিয়ে আসা এবং মলদ্বারে চুলকানির সঙ্গে পাইলস।
নির্বাচন লক্ষণ: শক্ত গাঁটযুক্ত মল + পাইলস + চুলকানি।
১৩. Aloe — এলো
বেরিয়ে আসা অর্শ, আঙুরের মতো গঠন, মলদ্বারে জ্বালা ও চুলকানি—বিশেষ করে মলত্যাগের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে।
রেপার্টরি সম্পর্ক: Hemorrhoids; protruding; grape-like; itching; burning.
১৪. Ratanhia — রাটানহিয়া
মলত্যাগের পর দীর্ঘ সময় মলদ্বারে তীব্র জ্বালা ও ব্যথা থাকতে পারে। কাঁটা বা ধারালো কিছু দিয়ে বিদ্ধ করার মতো অনুভূতি বর্ণিত হয়।
নির্বাচন লক্ষণ: মলত্যাগের পর দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা ও ব্যথা।
১৫. Paeonia — পিওনিয়া
মলদ্বার অত্যন্ত ব্যথাযুক্ত ও সংবেদনশীল। মলত্যাগের পরে ব্যথা, জ্বালা ও ক্ষতস্থানের মতো অনুভূতি থাকতে পারে।
১৬. Graphites — গ্রাফাইটিস
মলদ্বারে চুলকানি, আর্দ্রতা ও স্রাবের সঙ্গে পাইলসের কিছু চিত্রে ব্যবহৃত হয়।
১৭. Lycopodium — লাইকোপোডিয়াম
কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা, মলত্যাগে অসুবিধা এবং পাইলসের সমন্বয় থাকলে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়।
১৮. Carbo vegetabilis — কার্বো ভেজ
মলদ্বারে জ্বালা, চুলকানি ও ফুলে যাওয়া অর্শের সঙ্গে দুর্বলতা ও হজমের গোলমাল থাকতে পারে।
১৯. Capsicum — ক্যাপসিকাম
মলদ্বারে জ্বালা ও অস্বস্তির সঙ্গে মলত্যাগে ব্যথা। পাইলসের স্থানীয় ব্যথা ও জ্বালার ক্ষেত্রে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করা হয়।
২০. Causticum — কস্টিকাম
দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য ও মলত্যাগের সমস্যার সঙ্গে পাইলস। মলদ্বারে জ্বালা বা ব্যথার চিত্র থাকতে পারে।
২১. Lachesis — ল্যাকেসিস
গাঢ় বা নীলচে-বেগুনি শিরাজাতীয় অর্শের চিত্রে এবং স্পর্শে অসহিষ্ণুতার সঙ্গে বিবেচিত হয়।
২২. Calcarea fluorica — ক্যালকেরিয়া ফ্লোরিকা
শিরা ও টিস্যুর দৃঢ়তা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্শের কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়।
২৩. Millefolium — মিলেফোলিয়াম
রক্তপাতের প্রবণতা প্রধান হলে এবং রক্তপাতের সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে মিল থাকলে repertory-তে বিবেচিত হয়।
২৪. Phosphorus — ফসফরাস
সহজে রক্তপাত হওয়ার প্রবণতা এবং উজ্জ্বল রক্তের সঙ্গে অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মিললে বিবেচনা করা হয়।
২৫. Sabina — স্যাবাইনা
রক্তপাতযুক্ত অর্শের ক্ষেত্রে repertory-তে পাওয়া যায়। বিশেষ করে রক্তপাতের ধরন ও অন্যান্য সামগ্রিক লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচন করতে হয়।
২৬. Podophyllum — পডোফাইলাম
ডায়রিয়া, মলত্যাগের তীব্র প্রবণতা ও মলদ্বারের অস্বস্তির সঙ্গে পাইলসের চিত্রে বিবেচিত হয়।
২৭. Pulsatilla — পালসেটিলা
মলত্যাগের অনিয়ম, হজমের সমস্যা এবং শিরাজাতীয় অর্শের সঙ্গে রোগীর সামগ্রিক Pulsatilla লক্ষণ থাকলে নির্বাচন করা হয়।
২৮. Silicea — সিলিসিয়া
দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য, মলত্যাগে অতিরিক্ত চাপ এবং মলদ্বারের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়।
২৯. Sepia — সেপিয়া
পাইলসের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য, মলদ্বারের অস্বস্তি এবং নারীদের বিশেষ শারীরিক ও হরমোন-সম্পর্কিত সামগ্রিক লক্ষণ থাকলে বিবেচনা করা হয়।
৩০. Blumea odorata — ব্লুমিয়া ওডোরাটা
বাংলাদেশে পরিচিত একটি দেশীয় উদ্ভিদজাত হোমিওপ্যাথিক প্রস্তুতি। প্রচলিত হোমিওপ্যাথিক ব্যবহারে রক্তপাতযুক্ত পাইলসের ক্ষেত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
নির্বাচন লক্ষণ: বেদনাহীন রক্তপাতযুক্ত পাইলসের চিত্র।
Kent/Boger Repertory-তে পাইলসের গুরুত্বপূর্ণ Rubric
রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী নিচের Rubric-গুলো ব্যবহার করে একক ঔষধ নির্বাচন করা যেতে পারে।
Hemorrhoids — Piles
Aesculus, Aloe, Alumen, Calcarea fluorica, Causticum, Collinsonia, Graphites, Hamamelis, Lycopodium, Nitric acid, Nux vomica, Ratanhia, Silicea, Sulphur প্রভৃতি।
Hemorrhoids — Bleeding
Aconitum, Aesculus, Aloe, Capsicum, Collinsonia, Hamamelis, Hydrastis, Lycopodium, Millefolium, Nitric acid, Nux vomica, Phosphorus, Sabina, Sulphur প্রভৃতি।
Hemorrhoids — Dark, venous blood
Aloe, Hamamelis, Hydrastis, Kali muriaticum, Sulphur।
Hemorrhoids — Burning, smarting
Aesculus, Aloe, Arsenicum album, Capsicum, Carbo vegetabilis, Causticum, Fluoric acid, Graphites, Nux vomica, Ratanhia, Sulphur।
Hemorrhoids — Itching
Aesculus, Aloe, Capsicum, Carbo vegetabilis, Causticum, Hamamelis, Nitric acid, Nux vomica, Petroleum, Pulsatilla, Sulphur।
Hemorrhoids — Protruding
Aesculus, Aloe, Ammonium muriaticum, Capsicum, Carbo vegetabilis, Causticum, Collinsonia, Graphites, Hamamelis, Lachesis, Muratic acid, Nux vomica, Ratanhia, Sepia, Sulphur, Thuja।
Hemorrhoids — Grape-like, swollen
Aesculus, Aloe, Capsicum, Carbo vegetabilis, Causticum, Collinsonia, Graphites, Hamamelis, Lachesis, Muratic acid, Nux vomica, Ratanhia, Sulphur, Thuja।
Hemorrhoids — Sensitive, exquisitely painful
Aesculus, Aloe, Arsenicum album, Belladonna, Capsicum, Carbo vegetabilis, Causticum, Chamomilla, Collinsonia, Hamamelis, Hypericum, Lachesis, Lycopodium, Nitric acid, Nux vomica, Plantago, Ratanhia, Silicea, Sulphur।
Hemorrhoids — Mucous, continually oozing
Aloe, Ammonium muriaticum, Antimonium crudum, Capsicum, Carbo vegetabilis, Causticum, Pulsatilla, Sepia, Sulphur।
এখানে repertory-র তালিকা হলো সম্ভাব্য ঔষধের নির্দেশনা; শুধু একটি Rubric-এ কোনো ঔষধ থাকার কারণে সেটিকে সরাসরি প্রেসক্রাইব করা উচিত নয়। রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণ মিলিয়ে একক ঔষধ নির্বাচনই হোমিওপ্যাথিক কেস বিশ্লেষণের মূল বিষয়।
বায়োকেমিক পদ্ধতিতে প্রচলিত ঔষধ
হোমিওপ্যাথিক বায়োকেমিক চিকিৎসার প্রচলিত ধারণায়—
Calcarea fluorica: দীর্ঘস্থায়ী অর্শ ও শিরার দুর্বলতার চিত্রে।
Ferrum phosphoricum: রক্তপাতের সঙ্গে।
Magnesia phosphorica: ব্যথা প্রধান হলে।
তবে এগুলোকেও রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ ও সঠিক রোগ নির্ণয়ের ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন
পাইলস নিয়ন্ত্রণে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার মল নরম রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণও আঁশের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
যে খাবারগুলো উপকারী হতে পারে
- শাকসবজি
- ডাল
- সালাদ
- পাকা পেঁপে
- বেল
- আপেল
- কমলা ও অন্যান্য ফল
- গাজর
- মিষ্টি কুমড়া
- ভূসিযুক্ত বা পূর্ণশস্যের খাবার
- পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য উপযুক্ত তরল
যেসব অভ্যাস কমানো দরকার
- অতিরিক্ত কম আঁশযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
- অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার
- অতিরিক্ত পরিমাণে ফাস্টফুড
- দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া
- অপ্রয়োজনীয়ভাবে ল্যাক্সেটিভ ব্যবহার
- দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক আঁশের প্রয়োজন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন; সাধারণভাবে ২২–৩৪ গ্রাম/দিনের মতো পরিমাণ ব্যবহৃত নির্দেশনায় রয়েছে। তবে খাদ্যাভ্যাস, বয়স, স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থার ওপর প্রয়োজন নির্ভর করে।
পাইলস রোগীর দৈনন্দিন করণীয়
১. কোষ্ঠকাঠিন্য হতে দেওয়া যাবে না।
২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না।
৩. টয়লেটে অযথা দীর্ঘ সময় বসে থাকা যাবে না।
৪. নিয়মিত হাঁটা ও শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস করা ভালো।
৫. দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা এড়ানো উচিত।
৬. পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
৭. পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ করতে হবে।
৮. অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত।
৯. নিয়মিত ভারী ওজন তোলার অভ্যাস থাকলে তা পর্যালোচনা করা দরকার।
১০. অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিন ল্যাক্সেটিভ নিজে থেকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
১১. পাইলসের সঙ্গে ডায়রিয়া থাকলে তার কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নিতে হবে।
১২. মলদ্বার পরিষ্কার রাখতে হবে, তবে অতিরিক্ত ঘষাঘষি করা যাবে না।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতকে সবসময় পাইলস বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে প্রথমবার রক্তপাত হলে, বারবার রক্তপাত হলে বা রক্তপাতের কারণ পরিষ্কার না হলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নিচের অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত—
- প্রচুর বা বন্ধ না হওয়া রক্তপাত
- তীব্র মলদ্বার ব্যথা
- পেটব্যথা, জ্বর বা ডায়রিয়ার সঙ্গে রক্তপাত
- মাথা ঘোরা বা দুর্বল হয়ে যাওয়া
- কালো বা আলকাতরার মতো মল
- অর্শ বাইরে এসে প্রচণ্ড ব্যথাযুক্ত হয়ে যাওয়া
- দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও উপসর্গ না কমা।
গুরুতর রক্তপাত হলে রক্তস্বল্পতা বা অন্য জটিলতা হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-সংক্রান্ত কথা
হোমিওপ্যাথিতে উপরের ঔষধগুলো পাইলসের বিভিন্ন লক্ষণ অনুযায়ী ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ পাইলস সারিয়ে দেয়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, অর্শের জটিলতা বা বারবার ফিরে আসা উপসর্গের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয় ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা যেন বিলম্বিত না হয়।
পাইলসের চিকিৎসায় খাদ্যাভ্যাস ও মলত্যাগের অভ্যাস সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ; প্রয়োজনে চিকিৎসকের মাধ্যমে ওষুধ, রাবার ব্যান্ড লিগেশন, স্ক্লেরোথেরাপি, ইনফ্রারেড চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মতো চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে।
উপসংহার
পাইলস শুধু মলদ্বারের একটি স্থানীয় সমস্যা নয়; কোষ্ঠকাঠিন্য, খাদ্যাভ্যাস, মলত্যাগের অভ্যাস, জীবনযাপন এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় শুধু “পাইলসের ওষুধ” খোঁজার পরিবর্তে রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণ সংগ্রহ, সঠিক repertory analysis এবং Materia Medica-র সঙ্গে মিলিয়ে ঔষধ নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে রক্তপাত বা মলদ্বারের অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গকে অবহেলা না করে প্রয়োজনে যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা করানো উচিত।
হোমিওপ্যাথি পাঠশালা
শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষণভিত্তিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও Materia Medica অধ্যয়নের একটি শিক্ষামূলক উদ্যোগ।
লেখক:
ডা. ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, এ আর টাওয়ার রুম নাম্বার ৯, আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ। মোবাইল নাম্বার 01716651488
