বুকজ্বালার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
বুকজ্বালা কী?
বুকজ্বালা বা Heartburn (Pyrosis) হলো বুকের নিচের অংশ বা পাকস্থলীর ওপরের দিকে জ্বালাপোড়ার অনুভূতি। অনেক সময় এই জ্বালাপোড়া বুক থেকে গলা পর্যন্ত উঠে আসে এবং মুখে টক বা তিক্ত স্বাদ লাগে।
সাধারণত বেশি খাবার খাওয়া, ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, খাবারের পরপরই শুয়ে পড়া এবং রাতে শোয়ার সময় বুকজ্বালা বেশি হতে পারে।
পাকস্থলীর অ্যাসিড ও খাবার উল্টো দিকে খাদ্যনালীতে উঠে এলে খাদ্যনালীতে জ্বালা সৃষ্টি হয়। একে Acid Reflux বা অ্যাসিডের উল্টো প্রবাহ বলা হয়। বারবার এমন হলে তাকে GERD বলা হতে পারে।
বুকজ্বালাকে অনেক সময় হৃদ্যন্ত্রের ব্যথার সঙ্গে ভুল করা হয়। তাই নতুন বা তীব্র বুকব্যথাকে শুধু গ্যাস বা বুকজ্বালা মনে করে অবহেলা করা ঠিক নয়।
বুকজ্বালার কারণ
বুকজ্বালার সাধারণ কারণগুলো হলো:
অতিরিক্ত খাবার খাওয়া
একবারে অনেক খাবার খাওয়া
মসলাযুক্ত খাবার
অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার
চকলেট
পিপারমিন্ট
কার্বনেটেড পানীয়
অতিরিক্ত চা বা কফি
অ্যালকোহল
ধূমপান
খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া
খাওয়ার পরপরই ভারী ব্যায়াম করা
অতিরিক্ত ওজন
গর্ভাবস্থা
মানসিক চাপ
হায়াটাল হার্নিয়া
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বুকজ্বালার প্রধান লক্ষণ
বুকের নিচে জ্বালাপোড়া
পাকস্থলীর ওপরের অংশে জ্বালা
খাবারের পর বুক জ্বলা
গলা পর্যন্ত জ্বালা ওঠা
মুখে টক বা তিক্ত স্বাদ
টক ঢেঁকুর
পাকস্থলীর খাবার বা টক তরল মুখের দিকে উঠে আসা
বমি বমি ভাব
বমি
পেটে চাপ বা ভারীভাব
গলা ব্যথা
বারবার গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা
মুখে দুর্গন্ধ
দীর্ঘদিনের রিফ্লাক্সে কাশি বা কণ্ঠস্বর বসে যাওয়াও হতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে?
বুকজ্বালার সঙ্গে যদি তীব্র বুকব্যথা, বুক চেপে ধরার মতো অনুভূতি, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা বা ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড় কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
এছাড়া নিচের লক্ষণ থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার:
রক্তবমি
কালো পায়খানা
খাবার গিলতে কষ্ট
গিললে ব্যথা
বারবার বমি
কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
দীর্ঘদিন ধরে বারবার বুকজ্বালা হওয়া
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক প্রয়োজনে পরীক্ষা দিতে পারেন।
এন্ডোস্কপি বা গ্যাস্ট্রোস্কপি: খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর ভেতরের অবস্থা দেখার জন্য।
Esophageal Manometry: খাদ্যনালীর স্বাভাবিক কাজ ও চাপ পরীক্ষা করার জন্য।
Ambulatory pH Monitoring: খাদ্যনালীতে অ্যাসিড কতটা উঠে আসছে তা জানার জন্য।
Barium Swallow: খাদ্যনালীর গঠন ও কিছু ধরনের সমস্যা দেখার জন্য।
বুকজ্বালায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
হোমিওপ্যাথিতে শুধু রোগের নাম দেখে ঔষধ নির্বাচন করা হয় না। রোগীর কী ধরনের জ্বালা, কখন বাড়ে, কী কারণে বাড়ে, কী করলে কমে, কী ধরনের খাবারে সমস্যা হয় এবং সঙ্গে আর কী কী লক্ষণ আছে—এসব বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
একই রোগের জন্য সবার একই ঔষধ প্রয়োজন হয় না।
নিচে বুকজ্বালা ও অম্লতার ক্ষেত্রে Materia Medica ও Repertory-তে পাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধের লক্ষণ দেওয়া হলো।
Nux vomica
অতিরিক্ত খাবার, মসলা, চা-কফি বা অনিয়মিত খাবারের পর বুকজ্বালা।
টক ঢেঁকুর।
বমি বমি ভাব।
পাকস্থলীতে ভারীভাব।
খাবারের পর অস্বস্তি।
কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রবণতা থাকতে পারে।
রাতে বা ভোরের দিকে সমস্যা বাড়তে পারে।
মূল ভাব: অনিয়মিত জীবনযাপন ও অতিরিক্ত খাবারের সঙ্গে বুকজ্বালা ও অম্লতা।
Arsenicum album
বুক ও খাদ্যনালীতে তীব্র জ্বালাপোড়া।
টক ঢেঁকুর বা টক তরল মুখে উঠে আসা।
বমি বমি ভাব।
পাকস্থলীতে জ্বালা ও ব্যথা।
অস্থিরতা ও উদ্বেগের সঙ্গে জ্বালাপোড়া থাকতে পারে।
মূল ভাব: তীব্র জ্বালা, অম্লতা ও অস্থিরতা।
Natrum phosphoricum
অতিরিক্ত অম্লতা।
টক ঢেঁকুর।
মুখে টক স্বাদ।
টক তরল বা ভিনেগারের মতো টক বমি।
পাকস্থলীতে জ্বালাপোড়া।
মূল ভাব: টক স্বাদ ও টক ঢেঁকুর প্রধান লক্ষণ।
Robinia
তীব্র অম্লতা।
বারবার টক ঢেঁকুর।
টক তরল মুখে উঠে আসা।
পাকস্থলী ও খাদ্যনালীতে জ্বালাপোড়া।
রাতে বা শুয়ে পড়লে সমস্যা বাড়তে পারে।
মূল ভাব: অত্যন্ত টক রিফ্লাক্স ও তীব্র বুকজ্বালা।
Phosphorus
পাকস্থলী ও খাদ্যনালীতে জ্বালাপোড়া।
খাবার বা তরল মুখের দিকে উঠে আসা।
বমি বমি ভাব বা বমি।
ঠান্ডা খাবার বা পানীয়ের প্রতি আকর্ষণ থাকতে পারে।
পাকস্থলী খালি ও দুর্বল মনে হতে পারে।
মূল ভাব: জ্বালাপোড়ার সঙ্গে ঠান্ডা খাবার বা পানীয়ের আকর্ষণ ও রিফ্লাক্স।
Pulsatilla
চর্বিযুক্ত খাবার, পেস্ট্রি বা ভারী খাবারের পর বুকজ্বালা।
টক বা তিক্ত ঢেঁকুর।
মুখে খারাপ স্বাদ।
জিহ্বায় সাদা আবরণ।
তৃষ্ণা কম থাকে।
খাবার হজমে অস্বস্তি হয়।
মূল ভাব: চর্বিযুক্ত খাবারের পর বুকজ্বালা ও বদহজম, সঙ্গে তৃষ্ণা কম।
Ipecacuanha
বুকজ্বালার সঙ্গে প্রচণ্ড বমি বমি ভাব।
বমি হতে পারে।
বমির পরও বমি বমি ভাব থেকে যেতে পারে।
পাকস্থলীতে অস্বস্তি ও বায়ু থাকতে পারে।
মূল ভাব: বুকজ্বালার সঙ্গে প্রবল বমি বমি ভাব।
China officinalis
পেটে প্রচুর বায়ু জমা।
পেট ফাঁপা।
ঢেঁকুর হলে অস্বস্তি কমে।
টক বা তিক্ত ঢেঁকুর।
খাবার অনেকক্ষণ পাকস্থলীতে পড়ে থাকার মতো অনুভূতি।
মূল ভাব: অতিরিক্ত বায়ু, পেট ফাঁপা ও ঢেঁকুরে আরাম।
Calcarea carbonica
পাকস্থলীতে চাপ ও ভারীভাব।
খাবারের পর বদহজম।
পাকস্থলীর অস্বস্তির সঙ্গে দুর্বলতা।
রোগীর অন্যান্য সাধারণ লক্ষণও ঔষধটির সঙ্গে মিলতে হবে।
Staphysagria
ধূমপানের পর বুকজ্বালা হলে এবং রোগীর অন্যান্য লক্ষণও Staphysagria-এর সঙ্গে মিললে এই ঔষধ বিবেচনা করা হয়।
Aesculus hippocastanum
ঢেঁকুরে প্রধানত বাতাস বের হয়।
বুক ও পাকস্থলীতে জ্বালাপোড়া।
পাকস্থলীতে পাথরের মতো ভারী চাপ অনুভূত হয়।
Ferrum metallicum
খাবার খাওয়ার পরপরই বুকজ্বালা দেখা দিলে এবং অন্যান্য লক্ষণও ঔষধটির সঙ্গে মিললে Ferrum metallicum বিবেচনা করা যেতে পারে।
বুকজ্বালার Repertory Study
রেপার্টরিতে বুকজ্বালা শুধু একটি লক্ষণ হিসেবে নয়, বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি ও অবস্থার মাধ্যমে খোঁজা হয়। যেমন:
পাকস্থলীতে জ্বালাপোড়া
Arsenicum album, Argentum nitricum, Bismuthum, Carbo vegetabilis, Cantharis, Iris, Phosphorus, Sulphur প্রভৃতি।
পাকস্থলীর ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি
Argentum nitricum, Arsenicum album, Bryonia, Carbo vegetabilis, Lycopodium, Nux vomica, Phosphorus, Pulsatilla, Sepia, Sulphur প্রভৃতি।
টক ঢেঁকুর
Natrum phosphoricum, Robinia, Nux vomica, Lycopodium, Pulsatilla, Calcarea carbonica, Iris, Sulphur প্রভৃতি।
খাবারের পর সমস্যা বাড়ে
Argentum nitricum, Belladonna, Bryonia, Ignatia, Kali bichromicum, Nux vomica প্রভৃতি।
খেলে উপকার হয়
Anacardium, Chelidonium, Iodum, Natrum carbonicum, Phosphorus, Sepia, Sulphur প্রভৃতি।
শুয়ে পড়লে সমস্যা বাড়ে
Bryonia, Colchicum, Nux vomica প্রভৃতি ঔষধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেপার্টরি লক্ষণ পাওয়া যায়।
রেপার্টরি থেকে শুধু একটি সাধারণ Rubric দেখে ঔষধ নির্বাচন করা উচিত নয়। রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি মিলিয়ে ঔষধ নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।
রোগীর Case Taking-এর সময় যে বিষয়গুলো জানতে হবে
বুকজ্বালা কোথায় হয়?
কখন শুরু হয়?
খাবারের কতক্ষণ পর শুরু হয়?
শুয়ে পড়লে বাড়ে কি না?
রাতে বেশি হয় কি না?
টক বা তিক্ত তরল মুখে উঠে আসে কি না?
কোন খাবারে সমস্যা বাড়ে?
চা, কফি বা ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না?
বমি বমি ভাব বা বমি আছে কি না?
পেটে বায়ু ও ঢেঁকুর আছে কি না?
কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া আছে কি না?
খাবার খেলে উপকার হয় নাকি সমস্যা বাড়ে?
ঠান্ডা বা গরম পানীয়ে কী পরিবর্তন হয়?
মানসিক চাপের সঙ্গে সমস্যা বাড়ে কি না?
আগে গ্যাস্ট্রাইটিস, আলসার বা হায়াটাল হার্নিয়া ছিল কি না?
কোনো ওষুধ খাওয়ার পর সমস্যা শুরু হয়েছে কি না?
এই তথ্যগুলো রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ ও সামগ্রিক রোগচিত্র বুঝতে সাহায্য করে।
বুকজ্বালা কমাতে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস
অল্প পরিমাণে খাবার খান এবং অতিরিক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খান।
খাবারের পরপরই শুয়ে পড়বেন না।
রাতে ঘুমানোর কিছুক্ষণ আগে খাবার শেষ করুন।
যে খাবারে আপনার বুকজ্বালা বাড়ে তা চিহ্নিত করে পরিহার করুন।
অতিরিক্ত মসলা ও চর্বিযুক্ত খাবার কমিয়ে দিন।
কার্বনেটেড পানীয় কমান।
অতিরিক্ত চা ও কফি এড়িয়ে চলুন।
ধূমপান পরিহার করুন।
অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তবে সবার জন্য প্রতিদিন একই পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয় না।
উপসংহার
বুকজ্বালা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও বারবার হলে এর কারণ খুঁজে দেখা দরকার। অতিরিক্ত খাবার বা অম্লতা থেকে শুরু করে অ্যাসিড রিফ্লাক্স, গ্যাস্ট্রাইটিস, আলসার ও হায়াটাল হার্নিয়ার মতো বিভিন্ন কারণে বুকজ্বালা হতে পারে।
হোমিওপ্যাথিতে রোগীর লক্ষণ, কারণ, কখন বাড়ে বা কমে, সঙ্গে থাকা অন্যান্য লক্ষণ এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
তাই শুধু বুকজ্বালার নাম দেখে কোনো একটি ঔষধ নিজে থেকে গ্রহণ না করে যোগ্যতাসম্পন্ন ও রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে তীব্র বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, রক্তবমি, কালো পায়খানা, গিলতে কষ্ট বা অকারণে ওজন কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন করা জরুরি।
নিজে নিজে চিকিৎসা না করে রোগের কারণ নির্ণয় করুন এবং দক্ষ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
লেখক
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, এ আর টাওয়ার, রুম নাম্বার ৯, আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে
বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫১৪৮৮
