কানের ফোঁড়ার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
কানের ভেতর ফোঁড়া বা বহিঃকর্ণনালির ফোঁড়ার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
কানের ভেতর ফোঁড়া কী?
কানের নালির মুখ থেকে কানের পর্দার আগ পর্যন্ত অংশে ত্বক ও লোমকূপ রয়েছে। এই অংশের কোনো লোমকূপ বা তেলগ্রন্থিতে সংক্রমণ হলে ছোট ফোঁড়া বা পুঁজযুক্ত প্রদাহ হতে পারে। একে সাধারণভাবে কানের ভেতরের ফোঁড়া বলা হয়।
এটি অনেক সময় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, অতিরিক্ত ঘাম ও আর্দ্রতা, কটন বাড বা কাঠি দিয়ে কান খোঁচানো, নখ দিয়ে চুলকানো কিংবা সামান্য আঘাতের পর হতে পারে।
ফোঁড়া বড় হলে কানের নালি ফুলে গিয়ে কান বন্ধ লাগতে পারে এবং সাময়িকভাবে কম শোনাও যেতে পারে।
কানের ভেতর ফোঁড়ার সাধারণ লক্ষণ
১. কানের ভেতরে তীব্র ব্যথা
২. স্পর্শ করলে বা কান টানলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া
৩. কানের নালিতে ফোলা বা গুটির মতো অনুভূতি
৪. কান চুলকানো বা অস্বস্তি
৫. কানের ভেতর চাপ বা বন্ধভাব
৬. পুঁজ বা তরল জাতীয় স্রাব
৭. ফোলা বেশি হলে সাময়িকভাবে কম শোনা
৮. চিবানো, হাই তোলা বা মুখ নাড়ানোর সময় ব্যথা বৃদ্ধি
৯. কখনো ভোঁ ভোঁ বা শোঁ শোঁ শব্দ
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
কানের ব্যথা খুব বেশি হলে, জ্বর থাকলে, কান দিয়ে পুঁজ বা রক্ত বের হলে, শুনতে কমে গেলে, কানের চারপাশে ফোলা ছড়িয়ে পড়লে অথবা কয়েক দিনের মধ্যে সমস্যা না কমলে কানের ভেতর সরাসরি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা বা বারবার কানের সংক্রমণের ইতিহাস থাকলে অবহেলা করা উচিত নয়।
কানের ফোঁড়ায় হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন
হোমিওপ্যাথিতে একই রোগের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই ঔষধ প্রযোজ্য নয়। ব্যথার ধরন, ফোঁড়ার প্রকৃতি, পুঁজের বৈশিষ্ট্য, স্পর্শের অনুভূতি, ঠান্ডা-গরমের প্রভাব, প্রদাহের তীব্রতা এবং রোগীর অন্যান্য ব্যক্তিগত লক্ষণ বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
১. Belladonna
কান হঠাৎ লাল, গরম, ফুলে যায় এবং প্রচণ্ড স্পন্দনশীল ব্যথা থাকে। প্রদাহ তীব্র ও আকস্মিক। সামান্য স্পর্শেও ব্যথা বাড়তে পারে।
মূল ভাব: হঠাৎ তীব্র প্রদাহ, লালভাব, উত্তাপ ও স্পন্দনশীল ব্যথা।
২. Hepar sulphuris
কানের ফোঁড়ায় অত্যন্ত স্পর্শকাতরতা এবং সামান্য স্পর্শেই তীব্র ব্যথা। পুঁজ হওয়ার প্রবণতা থাকে। ঠান্ডায় সাধারণত সমস্যা বাড়ে এবং উষ্ণতায় আরাম অনুভূত হতে পারে।
মূল ভাব: অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা, পুঁজ হওয়ার প্রবণতা ও ঠান্ডায় বৃদ্ধি।
৩. Silicea
ফোঁড়া দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও সহজে পাকে না বা পুঁজ বের হতে দেরি হয়। পুঁজ হওয়ার প্রবণতা এবং বারবার একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মূল ভাব: ধীরে পাকা ফোঁড়া, পুঁজের প্রবণতা ও পুনরাবৃত্তি।
৪. Mercurius solubilis
প্রদাহের সঙ্গে পুঁজযুক্ত স্রাব, দুর্গন্ধ এবং অতিরিক্ত ঘাম থাকতে পারে। মুখ ও জিহ্বায় অস্বাভাবিক আর্দ্রতা বা লালা বৃদ্ধির মতো সামগ্রিক লক্ষণও থাকতে পারে।
মূল ভাব: প্রদাহ, পুঁজ, দুর্গন্ধ ও অতিরিক্ত স্রাব।
৫. Myristica sebifera
স্থানীয় ফোঁড়া ও পুঁজযুক্ত প্রদাহের ক্ষেত্রে বিবেচ্য একটি ঔষধ। ফোঁড়া দ্রুত পাকার প্রবণতা এবং স্থানীয় প্রদাহের লক্ষণ থাকলে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচন করা হয়।
মূল ভাব: পুঁজযুক্ত স্থানীয় প্রদাহ ও ফোঁড়া পাকার প্রবণতা।
৬. Arsenicum album
কানের প্রদাহের সঙ্গে জ্বালাপোড়া, অস্থিরতা ও দুর্বলতার মতো সামগ্রিক লক্ষণ থাকলে বিবেচনা করা যেতে পারে। উষ্ণতায় আরাম পাওয়ার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মূল ভাব: জ্বালাপোড়া, অস্থিরতা ও দুর্বলতা।
৭. Apis mellifica
কানের নালিতে ফোলা, লালভাব, স্পর্শে সংবেদনশীলতা ও জ্বালাপোড়া থাকলে রোগীর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: ফোলা, জ্বালাপোড়া ও স্পর্শকাতরতা।
৮. Pulsatilla
কানের সমস্যা বা স্রাবের সঙ্গে রোগীর সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে বন্ধভাব ও পরিবর্তনশীল উপসর্গের ধরন, ঔষধ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মূল ভাব: পরিবর্তনশীল উপসর্গ ও রোগীর সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য।
৯. Phosphorus
কানের সমস্যা বারবার হওয়ার প্রবণতা এবং নির্দিষ্ট সামগ্রিক সাংবিধানিক লক্ষণ থাকলে বিবেচ্য হতে পারে।
মূল ভাব: পুনরাবৃত্ত কানের সমস্যা ও সাংবিধানিক লক্ষণ।
১০. Sulphur
বারবার কানের সমস্যা, চুলকানি ও প্রদাহের প্রবণতার সঙ্গে রোগীর বিশেষ সাংবিধানিক লক্ষণ থাকলে বিবেচনা করা হয়।
মূল ভাব: পুনরাবৃত্ত প্রদাহ, চুলকানি ও সাংবিধানিক প্রবণতা।
ঔষধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
Belladonna বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে যখন প্রদাহ আকস্মিক, তীব্র, লাল ও গরম।
Hepar sulphuris বেশি গুরুত্বপূর্ণ যখন স্পর্শ সহ্য হয় না এবং পুঁজ হওয়ার প্রবণতা থাকে।
Silicea বিবেচ্য যখন ফোঁড়া ধীরে পাকে, পুঁজ বের হতে দেরি হয় বা সমস্যা বারবার ফিরে আসে।
Myristica sebifera স্থানীয় ফোঁড়া ও পুঁজযুক্ত প্রদাহের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য ঔষধ।
তবে শুধু রোগের নাম দেখে কোনো একটি ঔষধ নির্বাচন করা হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রোগীর পূর্ণাঙ্গ লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কেসটেকিংয়ে যেসব বিষয় খেয়াল করা দরকার
কানের ফোঁড়ার রোগী দেখার সময় চিকিৎসককে জানতে হবে:
কখন থেকে সমস্যা শুরু হয়েছে?
ব্যথা হঠাৎ নাকি ধীরে শুরু হয়েছে?
ব্যথা জ্বালাপোড়া, ছ্যাঁকা, ধকধকে নাকি টনটনে?
কান স্পর্শ করলে ব্যথা বাড়ে কি না?
কান টানলে বা চিবানোর সময় ব্যথা বাড়ে কি না?
কানের ভেতর ফোলা বা গুটি অনুভূত হয় কি না?
পুঁজ বা অন্য কোনো স্রাব আছে কি না?
স্রাবের রং ও গন্ধ কেমন?
শ্রবণশক্তি কমেছে কি না?
জ্বর বা শরীর খারাপ আছে কি না?
এর আগে একই সমস্যা হয়েছিল কি না?
কটন বাড, কাঠি বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে কান পরিষ্কার করার অভ্যাস আছে কি না?
ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে কি না?
এই তথ্যগুলো সঠিক ঔষধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সহায়ক।
যা করা উচিত নয়
কানের ভেতরের ফোঁড়া নিজে চেপে ফাটানো উচিত নয়।
কটন বাড, কাঠি, পিন, কলম বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে কানের নালি খোঁচানো উচিত নয়।
কানের ভেতরে নিজের ইচ্ছায় কোনো তেল, ড্রপ বা অন্য পদার্থ ব্যবহার করা উচিত নয়।
গোসলের সময় কানে অতিরিক্ত পানি ঢোকানো এড়িয়ে চলতে হবে।
কানের ভেতর পরিষ্কার করার নামে বারবার ঘষাঘষি করা উচিত নয়।
সতর্কতা
কানের ভেতরের ফোঁড়া দেখতে সাধারণ সমস্যা মনে হলেও কখনো এটি বহিঃকর্ণনালির সংক্রমণের অংশ হতে পারে। তীব্র ব্যথা, পুঁজ, জ্বর, দ্রুত ফোলা বৃদ্ধি, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া অথবা কানের চারপাশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ থাকলে কানের চিকিৎসায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
কানের পর্দায় ছিদ্র থাকার সম্ভাবনা থাকলে বা সঠিক রোগ নির্ণয় না হলে কানে কোনো ধরনের তরল বা ঔষধ নিজে থেকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
উপসংহার
কানের ভেতরের ফোঁড়ার চিকিৎসায় শুধু ফোঁড়া বা ব্যথার নাম বিবেচনা না করে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, স্থানীয় লক্ষণ, ব্যথার প্রকৃতি, পুঁজের বৈশিষ্ট্য, স্পর্শকাতরতা, রোগের শুরু ও পুনরাবৃত্তির ইতিহাস বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা প্রয়োজন।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় Belladonna, Hepar sulphuris, Silicea, Mercurius solubilis, Myristica sebifera, Arsenicum album, Apis mellifica, Pulsatilla, Phosphorus ও Sulphurসহ বিভিন্ন ঔষধ রোগীর লক্ষণানুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে।
নিজে নিজে চিকিৎসা করবেন না। কানের ভেতরের ফোঁড়া বা সংক্রমণের ক্ষেত্রে একজন দক্ষ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
লেখক পরিচিতি
ডা. ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, এ আর টাওয়ার, রুম নং ৯
আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫১৪৮৮
