হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সঠিক ঔষধ নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ঔষধের স্বাভাবিক ক্রিয়া বজায় রাখার জন্য রোগীর পথ্য ও জীবনযাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হোমিওপ্যাথিক Materia Medica-তে বিভিন্ন ঔষধের সঙ্গে কিছু খাদ্য, পানীয় ও অভ্যাসের সম্পর্ক উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট খাদ্য বা পানীয় ঔষধের ক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, আবার কোনোটি এন্টিডট হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক রোগীকে কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য বা অভ্যাস সাময়িকভাবে পরিহার করার পরামর্শ দিতে পারেন।
এখানে “পরিহারযোগ্য” বলতে প্রত্যেক মানুষের জন্য স্থায়ী খাদ্যনিষেধ বোঝানো হচ্ছে না। এটি নির্দিষ্ট ঔষধ, রোগীর লক্ষণ, শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নির্দিষ্ট ঔষধ ও পরিহারযোগ্য পথ্য
১. Zincum metallicum (Zinc)
পরিহারযোগ্য: মিষ্টি, মদ।
২. Veratrum album (Verat)
পরিহারযোগ্য: গরম কফি।
৩. Tuberculinum
পরিহারযোগ্য: দুধ, ফল, মিষ্টি, ডিম, মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবার।
৪. Tabacum
পরিহারযোগ্য: আপেল, ভিনিগার, মদ।
৫. Stramonium
পরিহারযোগ্য: লেবুর রস, কফি।
৬. Staphysagria
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা পানীয়, কফি, তামাক।
৭. Stannum metallicum
পরিহারযোগ্য: ক্রিমযুক্ত দুধ, গরম পানীয়।
৮. Spongia tosta
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা পানীয়, মিষ্টি, ধূমপান।
৯. Spigelia
পরিহারযোগ্য: ক্রিমযুক্ত দুধ, ঠাণ্ডা জল, চা, ধূমপান।
১০. Sepia
পরিহারযোগ্য: গরম দুধ, টকজাতীয় খাবার।
১১. Selenium
পরিহারযোগ্য: মদ, লেমনেড।
১২. Sanicula
বিশেষ সতর্কতা: গাড়ি বা নৌকায় ভ্রমণের কথা কিছু Materia Medica-তে উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি খাদ্য নয়, তাই একে পথ্য-তালিকার পরিবর্তে বিশেষ সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
১৩. Sabadilla
পরিহারযোগ্য: ক্রিমযুক্ত দুধ, ঠাণ্ডা জল।
১৪. Rhus toxicodendron
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা জল, কফি।
১৫. Radium bromatum
পরিহারযোগ্য: ধূমপান।
১৬. Opium
পরিহারযোগ্য: মদ।
১৭. Petroleum
পরিহারযোগ্য: উপবাস, বাঁধাকপি, শাকসবজি।
১৮. Phosphorus
পরিহারযোগ্য: উপবাস।
১৯. Phytolacca decandra
পরিহারযোগ্য: গরম পানীয়, দুধ, লবণ।
২০. Podophyllum
পরিহারযোগ্য: লবণ।
২১. Natrum sulphuricum
পরিহারযোগ্য: মাছ।
২২. Natrum carbonicum
পরিহারযোগ্য: দুধ, শাকসবজি।
২৩. Magnesia carbonica
পরিহারযোগ্য: দুধ, গরম খাদ্য।
২৪. Magnesia phosphorica
পরিহারযোগ্য: দুধ।
২৫. Millefolium
পরিহারযোগ্য: কফি।
২৬. Kali bichromicum
পরিহারযোগ্য: টকজাতীয় খাবার, দুধ।
২৭. Kali bromatum
পরিহারযোগ্য: লবণ, টকজাতীয় খাবার।
২৮. Kali iodatum
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা দুধ।
২৯. Kali muriaticum
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা পানীয়, চর্বি, ঘৃত।
৩০. Kali sulphuricum
পরিহারযোগ্য: কফি, টক ফল, তৈলাক্ত খাবার, গরম পানীয়, তামাক।
৩১. Kreosotum
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা খাবার।
৩২. Lac caninum
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা পানীয়।
৩৩. Colchicum
পরিহারযোগ্য: চিনি, মধু।
৩৪. Colocynthis
পরিহারযোগ্য: গরম দুধ, পনির।
৩৫. Copaiva
পরিহারযোগ্য: ঝিনুক।
৩৬. Crotalus horridus
পরিহারযোগ্য: টকজাতীয় খাবার, মদ।
৩৭. Croton tiglium
পরিহারযোগ্য: লেবুর রস, ফল, মিষ্টি।
৩৮. Cuprum metallicum
পরিহারযোগ্য: দুধ, চিনি, ডিম।
৩৯. Digitalis
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা পানীয়, টকজাতীয় খাবার।
৪০. Diphtherinum
পরিহারযোগ্য: দুধ।
৪১. Drosera
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা পানীয়, ঠাণ্ডা খাবার।
৪২. Ferrum metallicum
পরিহারযোগ্য: ডিম, চা, বিয়ার।
৪৩. Ferrum phosphoricum
পরিহারযোগ্য: গরম পানীয়।
৪৪. Gelsemium
পরিহারযোগ্য: লবণ, কফি, ধূমপান, মদ।
৪৫. Glonoinum
পরিহারযোগ্য: ঠাণ্ডা জল, কফি, মদ।
৪৬. Graphites
পরিহারযোগ্য: গরম পানীয়, ঠাণ্ডা খাবার, তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার, মদ।
৪৭. Hydrophobinum
বিশেষ সতর্কতা: গাড়িতে ভ্রমণের কথা কিছু Materia Medica-তে উল্লেখ রয়েছে। এটি কোনো খাদ্য বা পথ্য নয়।
৪৮. Ignatia amara
পরিহারযোগ্য: কফি, তামাক, ব্র্যান্ডি।
৪৯. Iodum
পরিহারযোগ্য: উপবাস, রুটি, লবণ।
৫০. Ipecacuanha
পরিহারযোগ্য: ক্রিমযুক্ত দুধ।
ঔষধের সঙ্গে পথ্য-পরিচর্যার গুরুত্ব
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ঔষধ নির্বাচন করা হয় রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ, মানসিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য, Modalities, Concomitants এবং ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে। একইভাবে ঔষধ চলাকালীন পথ্য-পরিচর্যাও রোগীর স্বাতন্ত্র্য অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন।
কোনো নির্দিষ্ট খাদ্য Materia Medica-তে পরিহারযোগ্য হিসেবে উল্লেখ থাকলে চিকিৎসক রোগীর ক্ষেত্রে তার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করবেন। সব রোগীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ করা প্রয়োজন হয় না।
বিশেষ করে দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ফল ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাদ্য অকারণে দীর্ঘদিন বাদ দেওয়া উচিত নয়। রোগীর বয়স, পুষ্টির প্রয়োজন, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য রোগ বিবেচনা করে পথ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কফি, চা ও তামাক
কিছু হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ক্ষেত্রে কফি, চা বা তামাকের সঙ্গে ঔষধের ক্রিয়ার সম্পর্ক Materia Medica-তে উল্লেখ আছে। তাই নির্দিষ্ট ঔষধ চলাকালীন চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে এসব সাময়িকভাবে পরিহার বা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিতে পারেন।
মদ ও অ্যালকোহল
কিছু ঔষধের ক্ষেত্রে মদকে পরিহারযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসার সময় রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য, রোগের প্রকৃতি এবং ব্যবহৃত ঔষধ বিবেচনা করে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসরণ করা উচিত।
এন্টিডট বলতে কী বোঝায়?
হোমিওপ্যাথিক Materia Medica-তে কোনো কোনো পদার্থ বা ঔষধকে অন্য একটি ঔষধের ক্রিয়া কমিয়ে দেওয়া বা প্রতিহত করার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একে সাধারণভাবে Antidote বা এন্টিডট বলা হয়।
তাই কোনো ঔষধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট খাদ্য বা পানীয় এন্টিডট হিসেবে উল্লেখ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি পরিহারের পরামর্শ দিতে পারেন।
পথ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের বিবেচনা
রোগীর জন্য পথ্য নির্ধারণের সময় কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
১. নির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ।
২. রোগীর প্রধান ও বিশেষ লক্ষণ।
৩. ঔষধের সঙ্গে খাদ্য বা পানীয়ের উল্লেখিত সম্পর্ক।
৪. রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা।
৫. পুষ্টিগত প্রয়োজন।
৬. অন্য কোনো রোগ বা চলমান চিকিৎসা।
৭. রোগীর দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন।
৮. দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না।
বিশেষ সতর্কতা
এই তালিকাটি হোমিওপ্যাথিক Materia Medica অধ্যয়ন ও চিকিৎসকদের Reference হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। এখানে উল্লিখিত প্রতিটি খাদ্য বা পানীয়কে প্রত্যেক রোগীর জন্য একইভাবে পরিহারযোগ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে খাদ্য পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
কোনো প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার শুধু এই তালিকার ভিত্তিতে দীর্ঘদিন বাদ দেওয়া উচিত নয়। ব্যক্তিগত চিকিৎসা ও পথ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে রোগীর পূর্ণাঙ্গ কেস বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উপসংহার
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ঔষধের নির্বাচন ও তার স্বাভাবিক ক্রিয়া বজায় রাখার ক্ষেত্রে পথ্য-পরিচর্যার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। Materia Medica-তে বর্ণিত এন্টিডট, বিরূপ প্রভাবকারী উপাদান এবং পরিহারযোগ্য খাদ্য সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান চিকিৎসকের চিকিৎসা-পরিকল্পনাকে আরও সুসংগঠিত করতে সহায়তা করতে পারে।
তাই ঔষধের নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাদ্য ও পানীয়ের তথ্য জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোন রোগীর ক্ষেত্রে কতটুকু পথ্য-নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন সেটিও বিচক্ষণতার সঙ্গে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এই আলোচনা মূলত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন এবং ক্লিনিক্যাল Reference-এর উদ্দেশ্যে। রোগীর ব্যক্তিগত চিকিৎসায় যোগ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ ও পথ্য গ্রহণ করা উচিত।
লেখক
ডা. ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, এ আর টাওয়ার রুম নাম্বার ৯, আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ। মোবাইল নাম্বার 01716651488
