হাইপারথাইরয়েডিজমের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
Hyperthyroidism বা অতিসক্রিয় থাইরয়েড: কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা ও লক্ষণভিত্তিক ঔষধ নির্বাচন
হাইপারথাইরয়েডিজম হলো এমন একটি অবস্থা, যখন থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি থাইরয়েড হরমোন তৈরি করে। এর ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হয়ে যায় এবং হৃদপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, পেশি ও অন্যান্য অঙ্গের ওপর বিভিন্ন প্রভাব পড়ে।
হাইপারথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে পরিচিত কারণগুলোর একটি হলো Graves' disease। এছাড়া Toxic multinodular goiter, Toxic adenoma, Thyroiditis এবং অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন বা আয়োডিন গ্রহণের মতো কারণও থাকতে পারে। সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণের আগে রোগের কারণ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
থাইরয়েড হরমোনের অতিরিক্ততা কীভাবে বোঝা যায়?
থাইরয়েড হরমোন বেড়ে গেলে শরীরের কার্যক্রম অনেকটা দ্রুত হয়ে যায়। ফলে দেখা দিতে পারে:
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।
হাত কাঁপা।
অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।
গরম সহ্য করতে না পারা।
স্বাভাবিক বা বেশি খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া।
অস্থিরতা, উদ্বেগ ও বিরক্তি।
ঘুমের সমস্যা।
বারবার পায়খানা হওয়া বা ডায়রিয়া।
পেশির দুর্বলতা।
চুল পড়া।
মাসিকের পরিমাণ কমে যাওয়া বা অনিয়ম হওয়া।
গলার সামনের অংশে থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া।
কিছু Graves' disease রোগীর চোখ লাল হওয়া, চোখ ফুলে ওঠা বা চোখের পেছনে চাপের অনুভূতি হতে পারে।
হাইপারথাইরয়েডিজমের প্রধান কারণ
Graves' disease
এটি একটি Autoimmune রোগ। শরীরের তৈরি TRAb বা TSI নামের অ্যান্টিবডি থাইরয়েডকে অতিরিক্ত হরমোন উৎপাদনে উদ্দীপিত করে।
Toxic multinodular goiter
থাইরয়েডের একাধিক গিঁট অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করতে পারে।
Toxic adenoma
থাইরয়েডের কোনো একটি গিঁট স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করতে পারে।
Thyroiditis
থাইরয়েড গ্রন্থিতে প্রদাহ হলে গ্রন্থিতে সঞ্চিত হরমোন রক্তে বের হয়ে সাময়িকভাবে হাইপারথাইরয়েডিজমের মতো অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগটি কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে নিজে থেকেই কমে যেতে পারে।
অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন বা আয়োডিন
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন বা আয়োডিন গ্রহণের কারণেও রক্তে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
হাইপারথাইরয়েডিজম নির্ণয়ের পরীক্ষা
শুধু লক্ষণের ভিত্তিতে হাইপারথাইরয়েডিজম নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
TSH
হাইপারথাইরয়েডিজমে সাধারণত TSH-এর মাত্রা কমে যায়।
Free T4
অনেক ক্ষেত্রে Free T4 বৃদ্ধি পায়।
T3
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে T4 স্বাভাবিক থাকলেও T3 বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী T3 পরীক্ষা করা হয়।
Thyroid antibody
Graves' disease-এর সন্দেহ থাকলে TRAb বা TSI পরীক্ষা করা যেতে পারে।
Thyroid ultrasound বা অন্যান্য পরীক্ষা
থাইরয়েডে গিঁট, গ্রন্থির আকার এবং রোগের কারণ বোঝার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাম বা অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষা করা হয়।
Subclinical Hyperthyroidism
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে TSH কম থাকে কিন্তু T3 ও Free T4 স্বাভাবিক থাকে। একে Subclinical Hyperthyroidism বলা হয়।
এ অবস্থায় সবার একই ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। রোগীর বয়স, উপসর্গ, হৃদরোগ, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণ বিবেচনা করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হাইপারথাইরয়েডিজমে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগের নামের পাশাপাশি রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টি, মানসিক অবস্থা, তাপমাত্রা-সংবেদনশীলতা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘুম, মল-মূত্র, হৃদস্পন্দন, ঘাম, ওজনের পরিবর্তন এবং রোগের কারণ বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
হোমিওপ্যাথিক Materia Medica-তে থাইরয়েডের অতিসক্রিয়তা ও সংশ্লিষ্ট লক্ষণসমষ্টির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঔষধের আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
Iodum
অতিরিক্ত বিপাকক্রিয়া, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, অস্থিরতা, অতিরিক্ত ক্ষুধা এবং গরম অনুভূতির মতো লক্ষণসমষ্টিতে Iodum-এর Materia Medica লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।
বিশেষ লক্ষণ:
অতিরিক্ত ক্ষুধা।
খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া।
অস্থিরতা।
গরম অনুভূতি।
দ্রুত বিপাকক্রিয়ার লক্ষণ।
Lycopus virginicus
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় এবং থাইরয়েডের অতিসক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লক্ষণসমষ্টিতে Lycopus virginicus বিবেচনা করা হয়।
বিশেষ করে হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন ও থাইরয়েড-সম্পর্কিত লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে Materia Medica-এর সামগ্রিক মিল যাচাই করা প্রয়োজন।
Spongia tosta
থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া, গলার চাপ বা টান অনুভূতি এবং শ্বাসনালির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লক্ষণসমষ্টিতে Spongia tosta-এর Materia Medica লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।
Natrum muriaticum
ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা, মানসিক চাপের সঙ্গে উপসর্গের সম্পর্ক এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য থাকলে Natrum muriaticum-এর সামগ্রিক লক্ষণসমষ্টি বিচার করা যেতে পারে।
Phosphorus
অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, উষ্ণতা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা এবং অন্যান্য বিশেষ শারীরিক-মানসিক বৈশিষ্ট্য থাকলে Phosphorus-এর Materia Medica লক্ষণ বিবেচনা করা হয়।
Lachesis
থাইরয়েডের সমস্যার সঙ্গে অতিরিক্ত উষ্ণতা, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি এবং গলার চারপাশে চাপ সহ্য না করার মতো নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকলে Lachesis-এর সামগ্রিক লক্ষণসমষ্টি মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
Nux vomica
অতিরিক্ত উত্তেজনা, অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা, পরিপাকের গোলযোগ এবং জীবনযাপনজনিত বিভিন্ন কারণে উপসর্গের পরিবর্তন থাকলে Nux vomica-এর লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
হাইপারথাইরয়েডিজমে ঔষধ নির্বাচনের মূলনীতি
একই রোগের নাম হলেও প্রত্যেক রোগীর লক্ষণ এক রকম নয়। তাই শুধু “হাইপারথাইরয়েডিজম” রোগের নাম দেখে একটি নির্দিষ্ট ঔষধ নির্বাচন করা উচিত নয়।
যেমন:
হৃদস্পন্দন ও বুক ধড়ফড় প্রধান হলে Lycopus virginicus-এর লক্ষণসমষ্টি যাচাই করা যেতে পারে।
অতিরিক্ত ক্ষুধা সত্ত্বেও দ্রুত ওজন কমে গেলে Iodum-এর Materia Medica লক্ষণ বিবেচনা করা যেতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হওয়ার সঙ্গে গলার বিশেষ অনুভূতি থাকলে Spongia tosta-এর লক্ষণসমষ্টি বিচার করা যেতে পারে।
অতিরিক্ত উষ্ণতা, তৃষ্ণা, দুর্বলতা ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের বিশেষ সমন্বয় থাকলে Phosphorus-এর লক্ষণসমষ্টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে চূড়ান্ত ঔষধ নির্বাচন রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি ও রোগের কারণ বিবেচনা করে করা উচিত।
খাদ্য ও জীবনযাপন
হাইপারথাইরয়েডিজমে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ বুক ধড়ফড়, অস্থিরতা ও ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই চা-কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা উপকারী হতে পারে।
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে।
ওজন দ্রুত কমে গেলে পর্যাপ্ত ক্যালরি ও প্রোটিন গ্রহণের দিকে নজর দিতে হবে।
অতিরিক্ত আয়োডিনযুক্ত সম্পূরক বা নিজে থেকে আয়োডিনের ঔষধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
ধূমপান পরিহার করা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে Graves' disease ও চোখের সমস্যার ক্ষেত্রে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
শারীরিক দুর্বলতা ও হৃদস্পন্দন বেশি থাকলে অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
হাইপারথাইরয়েডিজম হৃদপিণ্ড, হাড় এবং অন্যান্য অঙ্গের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর প্রচলিত চিকিৎসার মধ্যে Antithyroid ঔষধ, Radioactive iodine এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার রয়েছে। হৃদস্পন্দন ও কাঁপুনির মতো উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে Beta-blocker-ও ব্যবহৃত হতে পারে।
তাই হাইপারথাইরয়েডিজমের রোগী যদি ইতোমধ্যে Antithyroid ঔষধ গ্রহণ করেন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সেই ঔষধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
হোমিওপ্যাথিক ঔষধকে থাইরয়েডের অতিরিক্ত হরমোন নিয়ন্ত্রণের প্রমাণিত বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে উপস্থাপন করার মতো নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল প্রমাণ বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে চাইলে নিয়মিত TSH, Free T4 ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া এবং যোগ্য চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা জরুরি।
Thyroid Storm: একটি জরুরি অবস্থা
হাইপারথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে গুরুতর জটিলতাগুলোর একটি হলো Thyroid Storm। এটি জীবন-হুমকিপূর্ণ জরুরি অবস্থা। এতে অত্যন্ত দ্রুত হৃদস্পন্দন, উচ্চ জ্বর, অস্থিরতা বা বিভ্রান্তি, বমি বা ডায়রিয়া, হৃদযন্ত্রের গুরুতর সমস্যা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ওপর নির্ভর না করে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
উপসংহার
হাইপারথাইরয়েডিজম হলো থাইরয়েড গ্রন্থির অতিসক্রিয়তার কারণে শরীরে অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোনের উপস্থিতি। ওজন কমে যাওয়া, বুক ধড়ফড়, হাত কাঁপা, অতিরিক্ত ঘাম, গরম সহ্য না হওয়া, অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা ও বারবার পায়খানা হওয়া এর সাধারণ লক্ষণ।
রোগ নির্ণয়ের জন্য TSH, Free T4 ও T3 পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। Graves' disease-এর সন্দেহ থাকলে TRAb বা TSI পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টি অনুযায়ী Iodum, Lycopus virginicus, Spongia tosta, Natrum muriaticum, Phosphorus, Lachesis ও Nux vomica প্রভৃতি ঔষধের Materia Medica লক্ষণ বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে হাইপারথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে রোগের কারণ নির্ণয়, থাইরয়েডের হরমোনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে Thyroid Storm-এর মতো জরুরি অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া আবশ্যক।
রোগীর লক্ষণ, পরীক্ষার ফলাফল ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে নিবন্ধিত ও যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
ডাঃ ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল
এ আর টাওয়ার, রুম নাম্বার ৯
আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড
বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে
আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫১৪৮৮
:::
