কিডনি পাথুরি কী, কেন হয় ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সদৃশ ঔষধ নির্বাচন

কিডনি আমাদের শরীরের অতিরিক্ত পানি, লবণ, খনিজ ও বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। প্রস্রাবে থাকা কিছু খনিজ ও রাসায়নিক পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে গেলে সেগুলো ছোট ছোট স্ফটিক বা দানায় পরিণত হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব স্ফটিক একত্র হয়ে শক্ত পিণ্ড তৈরি করলে তাকে কিডনি পাথর বা Kidney Stone বলা হয়।

কিডনি থেকে পাথর মূত্রনালির বিভিন্ন অংশে চলে এলে মূত্রপাথুরি বা Urinary Calculus হিসেবেও পরিচিত হয়।

কিডনিতে পাথর কেন হয়?

কিডনিতে পাথর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকা। পানি কম পান করলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং পাথর তৈরির উপাদানগুলো সহজে জমাট বাঁধতে পারে।

এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমন—

- পর্যাপ্ত পানি না পান করা বা পানিশূন্যতা

- পরিবারে কিডনি পাথরের ইতিহাস থাকা

- বংশগত বা জেনেটিক প্রবণতা

- প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড বা অন্যান্য উপাদানের মাত্রা বেড়ে যাওয়া

- অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ

- কিছু ধরনের খাদ্যাভ্যাস

- স্থূলতা ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব

- কিছু বিপাকীয় বা কিডনি-সংক্রান্ত রোগ

- পূর্বে কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস

কিডনির পাথর প্রধানত calcium stone, uric acid stone, struvite stone এবং cystine stone—এই চার ধরনের হতে পারে।

কিডনি পাথুরির লক্ষণ

ছোট পাথর কিডনিতে অবস্থান করলে অনেক সময় কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। পাথর যখন ureter বা মূত্রনালির পথে নড়াচড়া করে, তখন সাধারণত উপসর্গ স্পষ্ট হয়।

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

- কোমর বা কিডনির স্থানে তীব্র ব্যথা

- এক পাশ থেকে তলপেট বা কুঁচকির দিকে ব্যথা ছড়িয়ে যাওয়া

- ব্যথা কিছুক্ষণ পরপর তীব্র হওয়া

- প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া

- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ

- প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত

- প্রস্রাব ঘোলা বা তলানিযুক্ত হওয়া

- বমি বমি ভাব বা বমি

পাথরের সঙ্গে মূত্রনালিতে সংক্রমণ হলে জ্বর, কাঁপুনি ও অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কিডনি পাথুরি কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

রোগীর লক্ষণ ও শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী—

- Urine examination

- Blood test

- Ultrasonography

- X-ray KUB

- CT scan

ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে পাথরের উপস্থিতি, আকার, অবস্থান এবং মূত্রনালিতে বাধা আছে কি না তা নির্ণয় করা হয়।

বিশেষ করে পাথরের আকার ও অবস্থান জানা চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিডনি পাথুরিতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় শুধুমাত্র “কিডনিতে পাথর” এই রোগনাম দেখে ওষুধ নির্বাচন করা হয় না। রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি, ব্যথার প্রকৃতি, ব্যথার স্থান ও বিস্তার, প্রস্রাবের বৈশিষ্ট্য, Modalities এবং Concomitant symptoms বিবেচনা করে সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করা হয়।

নিচের ঔষধগুলো কিডনি ও মূত্রপথের পাথর-সংক্রান্ত Materia Medica ও Repertory-তে গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচিত হয়।

১. Berberis Vulgaris

কিডনি ও মূত্রপথের ব্যথা এবং পাথর-সংক্রান্ত উপসর্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- কিডনির স্থানে ব্যথা

- ব্যথা কিডনি থেকে ureter বরাবর নিচে নামতে থাকে

- কুঁচকি, তলপেট বা উরুর দিকে ব্যথা ছড়িয়ে যায়

- প্রস্রাবের সঙ্গে তলানি থাকতে পারে

- ঘন ঘন প্রস্রাবের অনুভূতি

- বিশেষ করে বামদিকের renal pain-এর সঙ্গে characteristic symptoms থাকলে বিবেচনা করা হয়

মূল লক্ষণ:

Kidney pain + radiating pain + urinary symptoms

২. Ocimum Canum

তীব্র renal colic-এর একটি উল্লেখযোগ্য remedy-picture।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- অসহ্য কিডনি ব্যথা

- ব্যথার কারণে রোগী অস্থির হয়ে পড়ে

- শরীর মোচড়ানো বা কুঁকড়ে যাওয়ার প্রবণতা

- প্রস্রাব ঘোলা বা লালচে

- প্রস্রাবে রক্ত বা তলানি

- ডানদিকের renal symptoms-এর সঙ্গে characteristic picture থাকতে পারে

মূল লক্ষণ:

Severe renal colic + urinary sediment/blood

৩. Lycopodium Clavatum

বিশেষ করে ডানদিকের urinary symptoms-এর সঙ্গে এটি গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচিত হয়।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- ডান কিডনির দিকে সমস্যা

- কিডনি থেকে bladder-এর দিকে ব্যথা

- প্রস্রাবে লালচে বা brick-dust ধরনের তলানি

- পেট ফাঁপা

- ডানদিকে abdominal discomfort

- দীর্ঘদিনের বা পুনরাবৃত্ত urinary complaints-এর সঙ্গে characteristic symptoms

মূল লক্ষণ:

Right-sided renal tendency + urinary sediment + digestive symptoms

৪. Sarsaparilla Officinalis

প্রস্রাবের সঙ্গে তীব্র ব্যথা ও তলানি থাকলে এই remedy-picture বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- প্রস্রাবের শেষে তীব্র ব্যথা

- প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া

- ঘোলা প্রস্রাব

- সাদা তলানি

- অল্প অল্প প্রস্রাব

- মূত্রথলিতে ব্যথা

- বসা অবস্থায় ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব হতে পারে, অথচ দাঁড়িয়ে তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে প্রস্রাব হতে পারে

মূল লক্ষণ:

Pain at end of urination + burning + sediment

৫. Cantharis Vesicatoria

তীব্র urinary irritation ও burning-এর picture থাকলে এটি বিবেচনা করা হয়।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- কিডনি, bladder ও urinary tract-এ তীব্র জ্বালা

- প্রস্রাবের সময় প্রচণ্ড ব্যথা

- বারবার প্রস্রাবের বেগ

- অল্প অল্প প্রস্রাব

- প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত

- urinary tract-এ ধারালো বা কেটে যাওয়ার মতো ব্যথা

মূল লক্ষণ:

Intense burning + constant urging + painful/scanty urination

৬. Terebinthina

Renal region-এর তীব্র ব্যথা ও urinary burning-এর সঙ্গে characteristic urine changes থাকলে এটি বিবেচনা করা হয়।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- কিডনির স্থানে টেনে ধরার মতো তীব্র ব্যথা

- প্রস্রাবের সময় প্রচণ্ড জ্বালা

- urinary tract-এ burning

- প্রস্রাবে রক্ত

- প্রস্রাব লাল, বাদামি বা গাঢ় বর্ণের হতে পারে

- কিছু ক্ষেত্রে albuminuria-এর সঙ্গে urinary symptoms পাওয়া যায়

মূল লক্ষণ:

Renal pain + intense urinary burning + abnormal urine

৭. Calcarea Carbonica

কিছু রোগীর constitutional picture-এর সঙ্গে urinary calculi-এর প্রবণতা থাকলে এটি বিবেচনা করা হয়।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- পাথর তৈরির পুনরাবৃত্ত প্রবণতা

- urinary complaints-এর সঙ্গে characteristic constitutional symptoms

- টক গন্ধযুক্ত ঘাম বা শরীরের অন্যান্য নিঃসরণ

- হাড় ও calcium metabolism-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত ইতিহাস

- ইউরিক অ্যাসিড বা metabolic tendency-এর সঙ্গে urinary complaints

এখানে শুধুমাত্র “পাথর হয়েছে” বলে Calcarea Carbonica নির্বাচন না করে সম্পূর্ণ constitutional picture মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

৮. Phosphorus ও Phosphoric Acid

প্রস্রাবের বিশেষ ধরনের পরিবর্তন এবং phosphate-related urinary picture থাকলে Materia Medica অনুযায়ী এই ঔষধগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- সাদা বা ঘোলা প্রস্রাব

- দুধ বা whey-এর মতো appearance

- phosphate বা সাদা sediment-এর সঙ্গে urinary complaints

- অন্যান্য characteristic Phosphorus বা Phosphoric Acid symptoms

৯. Hydrangea Arborescens

Urinary calculus ও renal sediment-এর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ Materia Medica remedy।

নির্বাচনী লক্ষণ:

- কিডনি পাথরের প্রবণতা

- renal region-এ ব্যথা

- প্রস্রাবে তলানি

- urinary tract-এর calculous irritation

- প্রস্রাবে রক্তের সঙ্গে characteristic symptoms

এটিকে শুধু “stone-breaking medicine” হিসেবে না দেখে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণসমষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচন করা উচিত।


Repertory-ভিত্তিক ঔষধ নির্বাচন

কিডনি পাথুরির ক্ষেত্রে Repertory-তে নিম্ন ধরনের rubric গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—

Kidneys – Pain

- Right

- Left

- Extending to ureter

- Extending to groin

- Colicky

- Cutting

- Burning


Urination


- Difficult

- Frequent

- Scanty

- Burning

- Painful

- Urging

- Pain at end of urination


Urine

- Blood

- Sediment

- Crystals

- Red

- Brown

- Cloudy

- White sediment

Kidneys – Calculi / Gravel

Calculi, gravel, nephrolithiasis ও renal colic-এর rubric-এর সঙ্গে রোগীর অন্যান্য characteristic symptoms যুক্ত করে repertorization করা যেতে পারে।

Repertory থেকে Materia Medica—দুই ধাপে যাচাই

সঠিক remedy selection-এর জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে—

Case Taking → Characteristic Symptoms → Rubric Selection → Repertorization → Remedy Differentiation → Materia Medica Confirmation

অর্থাৎ repertory-তে কোনো ঔষধ বেশি grade পেলেই prescription চূড়ান্ত না করে Materia Medica-তে রোগীর characteristic symptom-picture-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ Differential Point

Berberis Vulgaris:

কিডনি থেকে ureter ও কুঁচকির দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা।

Ocimum Canum:

অত্যন্ত তীব্র renal colic-এর সঙ্গে urinary changes।

Lycopodium:

ডানদিকের renal tendency + digestive symptoms + urinary sediment।

Sarsaparilla:

প্রস্রাবের শেষে প্রচণ্ড ব্যথা + burning + sediment।

Cantharis:

অত্যন্ত তীব্র burning + constant urging + scanty painful urine।

Terebinthina:

তীব্র renal pain + urinary burning + abnormal urine।


Hydrangea:

Calculous tendency + renal/urinary sediment picture।

এভাবে একই রোগনামের বিভিন্ন symptom-picture-এর মধ্যে পার্থক্য করে সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করা যায়।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?

কিডনি পাথরের সঙ্গে নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

- জ্বর বা কাঁপুনি

- প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বা খুব কমে যাওয়া

- অসহ্য ও অব্যাহত ব্যথা

- বারবার বমি

- সংক্রমণের লক্ষণ

- কিডনিতে পানি জমার বা urinary obstruction-এর সন্দেহ

- একমাত্র কার্যকর কিডনি থাকা

- কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা

বিশেষ করে সংক্রমণের সঙ্গে urinary obstruction থাকলে এটি জরুরি অবস্থা হতে পারে।

কিডনি পাথুরি প্রতিরোধে করণীয়

কিডনি পাথর প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। তবে যাদের কিডনি বা হৃদ্‌যন্ত্রের কারণে পানি সীমিত রাখার পরামর্শ রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি গ্রহণ করবেন।

এ ছাড়া—

- অতিরিক্ত লবণ কমানো

- সুষম খাদ্য গ্রহণ

- অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন এড়িয়ে চলা

- ব্যক্তির পাথরের ধরন অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন

- পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম

- পুনরায় পাথর হলে প্রয়োজন অনুযায়ী stone analysis ও metabolic evaluation করা

- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত follow-up করা

উপসংহার

কিডনি পাথুরি একটি পরিচিত urinary problem। অনেক ছোট পাথর স্বাভাবিকভাবেই বের হয়ে যেতে পারে, আবার কিছু পাথর বড় হলে বা মূত্রনালিতে বাধা সৃষ্টি করলে বিশেষ চিকিৎসা বা urological intervention প্রয়োজন হতে পারে।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় পাথরের নাম বা শুধু Ultrasound report-এর ওপর নির্ভর না করে রোগীর ব্যথার স্থান, ব্যথার ধরন, ব্যথার বিস্তার, প্রস্রাবের পরিবর্তন, Modalities, Concomitants এবং constitutional characteristics বিবেচনা করে সদৃশ ঔষধ নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।

মূলনীতি:

রোগের নাম নয়—রোগীর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণই সদৃশ ঔষধ নির্বাচনের প্রধান ভিত্তি।

লেখক 

ডা. ইয়াকুব আলী সরকার

ইভা হোমিও হল

বাইপাইল, সাভার, ঢাকা

গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬

মোবাইল: ০১৭১৬৬৫১৪৮৮, ০১৬৮৬৯৮১৪৪৫