পঞ্চাশ সহস্রতমিক ঔষধের ইতিকথা
হ্যানিম্যানের শেষ জীবনের গবেষণা থেকে বাংলাদেশে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির প্রচলন
হোমিওপ্যাথির ইতিহাসে পঞ্চাশ সহস্রতমিক বা LM পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হোমিওপ্যাথির প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা স্যামুয়েল হ্যানিম্যান তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসাজীবনের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার শেষ পর্যায়ে ঔষধ প্রস্তুত ও প্রয়োগের একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এই পদ্ধতিই পরবর্তীকালে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি নামে পরিচিত হয়।
হ্যানিম্যান তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রচলিত শততমিক পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য নতুনভাবে ঔষধের শক্তিকরণ, তরল মাধ্যমে প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে পুনঃপ্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। তাঁর এই গবেষণার ফলাফল অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণে স্থান পায়।
তবে এই ৬ষ্ঠ সংস্করণ হ্যানিম্যানের জীবদ্দশায় প্রকাশিত না হওয়ায় তাঁর মৃত্যুর পর বহু বছর পর্যন্ত পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাজগতে ব্যাপকভাবে পরিচিত হতে পারেনি। পরবর্তীকালে ইউরোপ, ভারত এবং বাংলাদেশে কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসকের প্রচেষ্টায় এই পদ্ধতি নতুন করে আলোচনায় আসে।
হ্যানিম্যান ও হোমিওপ্যাথির বিকাশ
স্যামুয়েল ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডরিক হ্যানিম্যান ১৭৫৫ সালে জার্মানির মেইসেনে জন্মগ্রহণ করেন। চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন ও চিকিৎসা পেশায় প্রবেশের পর প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
১৭৯০ সালের দিকে সিনকোনা বা চায়না নিয়ে তাঁর বিখ্যাত পরীক্ষার মাধ্যমে সদৃশ বিধান বা Similia Similibus Curentur-এর ধারণা আরও সুস্পষ্টভাবে বিকশিত হয়। পরবর্তীকালে দীর্ঘ গবেষণা, ঔষধ-পরীক্ষা ও রোগীর চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাপদ্ধতি ক্রমশ সুসংগঠিত রূপ লাভ করে।
১৮১০ সালে প্রকাশিত হয় অর্গাননের প্রথম সংস্করণ। পরবর্তীতে ১৮১৯, ১৮২৪, ১৮২৯ এবং ১৮৩৩ সালে যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
অর্গাননের প্রতিটি সংস্করণে হ্যানিম্যান তাঁর পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে চিকিৎসাপদ্ধতিকে আরও পরিমার্জিত করেন। অর্থাৎ হ্যানিম্যানের চিকিৎসাচিন্তা একটি স্থির অবস্থায় থেমে ছিল না; বরং তাঁর জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিবর্তিত ও উন্নত হয়েছে।
শততমিক পদ্ধতি থেকে নতুন অনুসন্ধান
অর্গাননের প্রথম পাঁচটি সংস্করণের সময় হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রস্তুতিতে শততমিক বা Centesimal পদ্ধতির ব্যবহারই প্রধান ছিল।
কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার ফলে হ্যানিম্যান ঔষধের শক্তিকরণ ও পুনঃপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দেন। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী রোগে একই ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ, রোগীর জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়া এবং ঔষধের অপ্রয়োজনীয় তীব্রতা কমানোর বিষয়টি তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন যেখানে ঔষধের শক্তিকরণকে আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঔষধকে তরল মাধ্যমে প্রয়োগ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃপ্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়।
এই গবেষণার ফলাফলই অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির আবির্ভাব
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ইংরেজি নাম সাধারণত LM বা 50 Millesimal Potency হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
‘LM’ শব্দটি ৫০,০০০-এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রচলিত শততমিক পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতির শক্তিকরণ প্রক্রিয়া ও প্রয়োগপদ্ধতি আলাদা।
হ্যানিম্যান অর্গাননের ২৭০ নম্বর সূত্রের পাদটীকায় নতুন পদ্ধতিতে ঔষধ প্রস্তুতের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। সেখানে তিনি ঔষধের মূল পদার্থের ধারাবাহিক ঘর্ষণ, তরলীকরণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে শক্তিকরণের একটি বিশেষ পদ্ধতির কথা বর্ণনা করেন।
এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল ঔষধের অন্তর্নিহিত আরোগ্যকারী শক্তির বিকাশ ঘটানো এবং রোগীর জীবনীশক্তির ওপর অপ্রয়োজনীয় তীব্র প্রভাব কমিয়ে চিকিৎসাকে আরও সূক্ষ্মভাবে পরিচালনা করা।
১৮৩৮ থেকে ১৮৪২: হ্যানিম্যানের শেষ পর্যায়ের পরীক্ষা
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৮৩৮ থেকে ১৮৪২ সালের মধ্যে হ্যানিম্যান নতুন পদ্ধতির ঔষধ প্রস্তুত ও প্রয়োগ নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করেন।
এই সময়ে তিনি রোগীদের চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতির ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ঔষধের শক্তি, পুনঃপ্রয়োগ এবং রোগীর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি পদ্ধতিটিকে আরও পরিমার্জিত করেন।
১৮৪২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশক সোয়াবকে লেখা একটি চিঠিতে হ্যানিম্যান তাঁর অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণের কাজ সম্পন্ন করার কথা জানান। দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমে তিনি তাঁর চিকিৎসাচিন্তার শেষ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাগুলো এই সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত করেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশের আগেই হ্যানিম্যান মৃত্যুবরণ করেন।
অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণকে হোমিওপ্যাথির ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার একটি কারণ হলো এতে হ্যানিম্যান তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসাজীবনের শেষ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা সংযোজন করেছিলেন।
এই সংস্করণে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির পাশাপাশি ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ, রোগীর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসার সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া যায়।
কিন্তু হ্যানিম্যান ১৮৪৩ সালে মৃত্যুবরণ করার পর তাঁর পাণ্ডুলিপি দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত অবস্থায় থাকে।
ফলে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের বহু বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হ্যানিম্যানের শেষ পর্যায়ের এই পদ্ধতি সম্পর্কে সরাসরি অধ্যয়ন ও ব্যবহার করার সুযোগ পাননি।
৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্ব
হ্যানিম্যানের মৃত্যুর পর অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণের পাণ্ডুলিপি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মেলানীর অধিকারে ছিল।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে পাণ্ডুলিপিটি দীর্ঘদিন প্রকাশিত হয়নি। অবশেষে হ্যানিম্যানের মৃত্যুর প্রায় সাত দশক পর ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশের পথ উন্মুক্ত হয়।
১৯২০ সালে জার্মান ভাষায় অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে ডা. উইলিয়াম বোরিক এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন।
এর ফলে হ্যানিম্যানের শেষ জীবনের চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক হোমিওপ্যাথিক সমাজে নতুন করে আলোচনার সুযোগ পায়।
কেন হ্যানিম্যানের বহু বিখ্যাত অনুসারী পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি ব্যবহার করেননি?
এখানে একটি ঐতিহাসিক বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. বোনিংহাউসেন, ডা. কনস্টান্টাইন হেরিং, ডা. অ্যাডলফ লিপে, ডা. রবার্ট এলিস ডাজন, ডা. ক্যারল ডানহাম, ডা. রিচার্ড হিউজেস, ডা. এইচ. সি. অ্যালেন, ডা. টি. এফ. অ্যালেন, ডা. ই. বি. ন্যাশ, ডা. জেমস টাইলার কেন্টসহ বহু বিখ্যাত চিকিৎসকের চিকিৎসাজীবনের অধিকাংশ সময়ে অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত ছিল না।
তাঁদের অনেকেই হ্যানিম্যানের আগের সংস্করণ ও তাঁদের নিজস্ব চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে শততমিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন।
তাই তাঁদের গ্রন্থে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির আলোচনা না থাকা বা সীমিত থাকা অস্বাভাবিক নয়।
এখানে তাঁদের চিকিৎসাগত অবদানকে ছোট করার কোনো প্রশ্ন নেই। বরং এটি মূলত একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা—হ্যানিম্যানের শেষ পর্যায়ের পদ্ধতি তাঁদের হাতে যথাসময়ে পৌঁছায়নি।
১৯৫০: পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির পুনর্জাগরণ
অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়নি।
১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে ফ্রান্সের ডা. চার্লস পাহুদ British Homoeopathic Journal-এ হ্যানিম্যানের ৫০ সহস্রতমিক শক্তি নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এই লেখাটি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করে।
হ্যানিম্যানের শেষ জীবনের এই পদ্ধতি তখন আর কেবল একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপির বিষয় থাকল না; বরং চিকিৎসকদের একটি অংশ নতুন করে এর ব্যবহারিক মূল্য নিয়ে চিন্তা শুরু করেন।
১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬: ডা. পিয়ের শ্মিটের অবদান
জেনেভার ডা. পিয়ের শ্মিট পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে তিনি British Homoeopathic Journal এবং Journal of the American Institute of Homoeopathy-সহ বিভিন্ন পত্রিকায় এই পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন।
তাঁর লেখালেখির ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের একটি অংশ হ্যানিম্যানের ৬ষ্ঠ সংস্করণ ও LM পদ্ধতির দিকে নতুন করে মনোযোগ দেন।
ভারতে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির প্রচার
১৯৫০-এর দশকে ভারতেও এই পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
১৯৫৭ সাল থেকে ভারতের ‘হ্যানিম্যান’ পত্রিকায় ডা. দেবেন্দ্রকুমার রায়, ডা. খগেন্দ্রনাথ বসু ও ডা. বিজয়কুমার বসুসহ কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।
কলকাতার হ্যানিম্যান পাবলিশিং কোম্পানিও পরবর্তীকালে এই পদ্ধতির কিছু ঔষধ প্রস্তুত করে।
ভারতে এই আলোচনা ও ব্যবহার পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশে পঞ্চাশ সহস্রতমিক ঔষধের ইতিহাস
বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ইতিহাসেও পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির প্রচলন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৫৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রথিতযশা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ডা. চণ্ডীপদ চক্রবর্তী পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ঔষধ প্রস্তুত ও প্রয়োগ শুরু করেন।
বাংলাদেশে পঞ্চাশ সহস্রতমিক ঔষধের ব্যবহারিক চর্চার ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পরবর্তীতে তাঁর সহযোগিতায় চট্টগ্রামের প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ডা. হরিমোহন চৌধুরী তাঁর কসমোপলিটান হোমিও স্টোরের মাধ্যমে ১৯৬১ সাল থেকে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ঔষধ প্রস্তুত ও পরিবেশন শুরু করেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রস্তুত ও চিকিৎসাচর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতিকে বুঝতে হলে শুধু ‘LM’ নামটি জানা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ঔষধ প্রস্তুতির বিশেষ পদ্ধতি, তরল মাধ্যমে প্রয়োগ, মাত্রার পুনঃপ্রয়োগ এবং রোগীর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী চিকিৎসা পরিচালনা।
ঔষধের শক্তিকরণ
অর্গাননের ২৭০ নম্বর সূত্র ও পাদটীকায় হ্যানিম্যান নতুন পদ্ধতিতে ঔষধ প্রস্তুতির বিশেষ প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছেন।
এই প্রক্রিয়ায় মূল ঔষধি পদার্থকে নির্দিষ্ট অনুপাতে শক্তিকরণ করা হয় এবং পরবর্তীতে বিশেষ পদ্ধতিতে তরল মাধ্যমে প্রয়োগযোগ্য করা হয়।
হ্যানিম্যানের মতে, এই প্রস্তুতিপদ্ধতির মাধ্যমে ঔষধের অন্তর্নিহিত আরোগ্যকারী শক্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
তরল মাধ্যমে প্রয়োগ
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঔষধকে তরল মাধ্যমে প্রয়োগ করা।
এর ফলে একই ঔষধের মাত্রাকে রোগীর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তন ও পুনঃপ্রয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
পুনঃপ্রয়োগ
অর্গাননের ২৪৬ ও ২৪৮ নম্বর সূত্রে দীর্ঘস্থায়ী রোগে ঔষধ পুনঃপ্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক রোগীকে একই নিয়মে প্রতিদিন ঔষধ দিতে হবে। রোগীর বর্তমান লক্ষণ, পূর্ববর্তী মাত্রার প্রতিক্রিয়া এবং রোগের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে পুনঃপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
রোগীর প্রতিক্রিয়ার গুরুত্ব
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতিতে রোগীর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি মাত্রা দেওয়ার পর রোগীর লক্ষণ পরিবর্তন, নতুন লক্ষণের উদ্ভব, পুরোনো লক্ষণের পরিবর্তন এবং সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি বা অবনতির ওপর নজর রাখতে হয়।
অর্থাৎ শুধু ঔষধের নাম ও শক্তি জানাই যথেষ্ট নয়; রোগীর পরিবর্তিত লক্ষণচিত্র বুঝতে পারাও চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অর্গাননের ২৪৬ নম্বর সূত্র ও পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি
অর্গাননের ২৪৬ নম্বর সূত্রে হ্যানিম্যান দীর্ঘস্থায়ী রোগে ঔষধের পুনঃপ্রয়োগ এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এখানে তাঁর চিকিৎসাচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়—একটি মাত্রা দিয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পরিবর্তে রোগীর পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা পরিচালনা করা।
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির বিকাশের সঙ্গে এই ধারণার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্গাননের ২৪৮ নম্বর সূত্র
২৪৮ নম্বর সূত্রে রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ঔষধ পুনঃপ্রয়োগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
অচির রোগ ও চির রোগের ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা ও প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী পুনঃপ্রয়োগের ব্যবধান ভিন্ন হতে পারে।
এখানে মূল শিক্ষা হলো—ঔষধ পুনঃপ্রয়োগের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক নিয়মের পরিবর্তে রোগীর বর্তমান অবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্গাননের ২৪৯ নম্বর সূত্র
২৪৯ নম্বর সূত্রে ভুল ঔষধের কারণে রোগীর অবস্থার পরিবর্তন বা নতুন লক্ষণ সৃষ্টি হলে চিকিৎসকের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে।
হ্যানিম্যানের চিকিৎসাপদ্ধতিতে ভুল ঔষধের প্রভাবকে অবহেলা করা হয়নি। বরং রোগীর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্গাননের ২৭০ নম্বর সূত্র
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ইতিহাসে ২৭০ নম্বর সূত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই হ্যানিম্যান ঔষধের শক্তিকরণ ও নতুন প্রস্তুতিপদ্ধতির বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেন।
এই সূত্রের পাদটীকায় তিনি পূর্ববর্তী পদ্ধতির তুলনায় নতুন প্রস্তুতিপদ্ধতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন।
এ কারণে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি অধ্যয়ন করতে গেলে ২৭০ নম্বর সূত্র ও এর পাদটীকা গভীরভাবে অধ্যয়ন করা অপরিহার্য।
শততমিক ও পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির মধ্যে মূল পার্থক্য
শততমিক ও পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির পার্থক্য শুধু পটেন্সির নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতিতে প্রস্তুতিপ্রণালী, তরল মাধ্যমে প্রয়োগ, মাত্রার পরিবর্তন, পুনঃপ্রয়োগ এবং রোগীর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী চিকিৎসা পরিচালনার একটি বিশেষ কাঠামো রয়েছে।
তাই LM পদ্ধতিকে শুধু শততমিক পদ্ধতির ‘আরও উচ্চ শক্তি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়।
এটি হ্যানিম্যানের চিকিৎসাচিন্তার শেষ পর্যায়ে বিকশিত একটি পৃথক প্রস্তুতি ও প্রয়োগপদ্ধতি।
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির সম্ভাব্য সুবিধা সম্পর্কে হ্যানিম্যানের ধারণা
হ্যানিম্যানের ৬ষ্ঠ সংস্করণের আলোচনার ভিত্তিতে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির কয়েকটি উদ্দেশ্য ছিল—
১. ঔষধের আরোগ্যকারী শক্তির সূক্ষ্ম বিকাশ।
২. অপ্রয়োজনীয় তীব্র ঔষধজ প্রতিক্রিয়া কমানোর চেষ্টা।
৩. রোগীর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী ঔষধ পুনঃপ্রয়োগের সুযোগ।
৪. দীর্ঘস্থায়ী রোগে চিকিৎসাকে আরও ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করা।
৫. ঔষধের মাত্রা ও প্রয়োগকে রোগীর পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা।
তবে এগুলোকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় প্রমাণিত কার্যকারিতার দাবি হিসেবে না দেখে হ্যানিম্যানের নিজস্ব চিকিৎসাতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে বোঝা উচিত।
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
পঞ্চাশ সহস্রতমিক ঔষধের নাম বা শক্তি জানা মানেই এই পদ্ধতিতে সঠিক চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।
ঔষধ নির্বাচনের আগে রোগীর পূর্ণাঙ্গ লক্ষণচিত্র, রোগের প্রকৃতি, মানসিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পূর্ববর্তী চিকিৎসা, ব্যবহৃত ঔষধ এবং বর্তমান প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে গুরুতর, দ্রুত অবনতিশীল বা জীবন-ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কেবল কোনো লেখার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা বিলম্ব করা উচিত নয়।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রেও রোগ নির্ণয়, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে রেফার করার দায়িত্ব চিকিৎসকের রয়েছে।
একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
হ্যানিম্যান তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছেন এবং অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণে তা সংযোজন করেছেন।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগে এই সংস্করণ প্রকাশিত না হওয়ায় তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের অনেক বিখ্যাত চিকিৎসক এই পদ্ধতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানতে পারেননি।
অর্থাৎ কোনো চিকিৎসাপদ্ধতির ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে শুধু পরবর্তী সময়ের চিকিৎসকদের গ্রন্থ পড়লেই যথেষ্ট নয়; মূল প্রতিষ্ঠাতার শেষ পর্যায়ের লেখা ও সংশোধিত মতামতও অধ্যয়ন করা জরুরি।
বাংলাদেশে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
বাংলাদেশে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির চর্চার ইতিহাসের সঙ্গে ডা. চণ্ডীপদ চক্রবর্তী ও ডা. হরিমোহন চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
ডা. চণ্ডীপদ চক্রবর্তী ১৯৫৮ সাল থেকে এই পদ্ধতির ঔষধ প্রস্তুত ও প্রয়োগ শুরু করেছিলেন বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে ডা. হরিমোহন চৌধুরী ১৯৬১ সাল থেকে কসমোপলিটান হোমিও স্টোরের মাধ্যমে এই পদ্ধতির ঔষধ প্রস্তুত ও পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত হন।
তাঁদের সময়ে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা সহজ ছিল না। অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণ তখনও সাধারণ চিকিৎসকদের কাছে খুব বেশি পরিচিত ছিল না এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও LM পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা মাত্র শুরু হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মাটিতে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ঔষধ প্রস্তুত ও চিকিৎসায় ব্যবহার একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উপসংহার
পঞ্চাশ সহস্রতমিক ঔষধের ইতিকথা মূলত হ্যানিম্যানের দীর্ঘ গবেষণা ও চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার শেষ পর্যায়ের ইতিহাস।
অর্গাননের প্রথম পাঁচটি সংস্করণের শততমিক পদ্ধতি থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যায়ে নতুন প্রস্তুতিপদ্ধতির অনুসন্ধান, অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণে তার অন্তর্ভুক্তি, দীর্ঘদিন প্রকাশিত না থাকা, ১৯২০ সালে ৬ষ্ঠ সংস্করণের প্রকাশ, ১৯৫০-এর দশকে চার্লস পাহুদ ও পিয়ের শ্মিটের মাধ্যমে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসা, ভারতে এর প্রসার এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে ডা. চণ্ডীপদ চক্রবর্তী ও ডা. হরিমোহন চৌধুরীর মাধ্যমে এর ব্যবহারিক চর্চা—সব মিলিয়ে এটি হোমিওপ্যাথির ইতিহাসের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়।
পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতিকে যথাযথভাবে বুঝতে হলে শুধু LM নামটি জানা বা কয়েকটি শক্তি মুখস্থ করা যথেষ্ট নয়। অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণের মূল বক্তব্য, বিশেষ করে ২৪৬, ২৪৮, ২৪৯ ও ২৭০ নম্বর সূত্র ও সংশ্লিষ্ট পাদটীকা অধ্যয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে হ্যানিম্যানের মূল জার্মান পাঠ, পরবর্তী ঐতিহাসিক দলিল এবং বিভিন্ন চিকিৎসকের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার তুলনামূলক অধ্যয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
হোমিওপ্যাথির ইতিহাসে পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি তাই শুধু একটি নতুন পটেন্সির আবির্ভাব নয়; এটি হ্যানিম্যানের শেষ জীবনের চিকিৎসাচিন্তা, গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসাপদ্ধতিকে আরও সূক্ষ্ম করার একটি প্রচেষ্টার ঐতিহাসিক দলিল।
তথ্যসূত্র ও অধ্যয়নের ভিত্তি:
স্যামুয়েল হ্যানিম্যান, Organon of Medicine, ৬ষ্ঠ সংস্করণ; বিশেষভাবে ২৪৬, ২৪৮, ২৪৯ ও ২৭০ নম্বর সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট পাদটীকা; অর্গাননের বিভিন্ন সংস্করণের ঐতিহাসিক বিবরণ; পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশিত ঐতিহাসিক হোমিওপ্যাথিক সাহিত্য।
লেখক
ডাঃ ইয়াকুব আলী সরকার
সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন হোমিওপ্যাথিক ফোরাম
গভঃ রেজিঃ নং ২৩৮৭৬
ইভা হোমিও হল, এ আর টাওয়ার, রুম নাম্বার ৯
আশুলিয়া থানা বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে, বাইপাইল, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ। মোবাইল নাম্বার 01716651488
